আকমল হোসেন, মৌলভীবাজার |
এতকাল ধারেকাছের মানুষরাই হয়তো মোবারকপুর নামের গ্রামটিকে চিনতেন। জাতিসংঘের মহাসচিবের সফর রাতারাতি মোবারকপুরকে নিয়ে এসেছে পাদপ্রদীপের আলোয়। বিস্তারিত এবারের মূল রচনায়
১৫ নভেম্বরের (২০১১) সকাল। মোবারকপুর। বাংলাদেশের আর দশটা গ্রামের মতোই শান্ত, ছায়াময় একটা গ্রাম। সকালের হালকা কুয়াশা কেটে গেছে। ঝকঝকে আকাশ। পথে পথে, গ্রামের গাছপালার ফাঁকে, এখানে-ওখানে অনেক মানুষ। সবার চোখ আকাশপানে। কখন আসবেন অতিথি। অপেক্ষায় গোটা মোবারকপুর। বেলা পৌনে ১১টার দিকে আকাশে দেখা দিল বহু কাঙ্ক্ষিত সেই হেলিকপ্টার। সারা তল্লাট সরব করে সালন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাঠে অবতরণ করে যন্ত্রযান। আর সেই হেলিকপ্টার থেকে নেমে আসেন মোবারকপুরবাসীর কাছে প্রত্যাশার চেয়েও উজ্জ্বল একজন ব্যক্তিত্ব—জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুন। তাঁর গাড়িটি সোনালি রং ধরা ধানখেতের মধ্য দিয়ে পাকা সড়ক ধরে এগিয়ে চলে সামনের দিকে। গন্তব্য মোবারকপুর কমিউনিটি ক্লিনিক। এই ক্লিনিকটি পরিদর্শন করতেই হাজার হাজার মাইল পথ পাড়ি দিয়ে এসেছেন বান কি মুন। এই কমিউনিটি ক্লিনিকে গর্ভবতী মায়েদের স্বাভাবিক প্রসবে উদ্বুদ্ধকরণ, মা ও নবজাতককে সেবা প্রদান, টিকাদান, পরিবার পরিকল্পনা ইত্যাদি প্রদান করা হয়। দশ গ্রামের মানুষ দূর থেকে অতিথির গাড়িটি দেখে। তাদের চোখের কৌতূহল যেন আর ফুরোয় না।
ছোট গ্রামে বড় অতিথি
বান কি মুন এসেই কমিউনিটি ক্লিনিকের সামনে মাটিতে বিছানো চাদরে বসে পড়েন। কথা বলেন কিশোরী ক্লাবের সদস্যদের সঙ্গে। মা ও শিশু স্বাস্থ্যসেবায় বাংলাদেশের সাফল্যের প্রশংসা করেন তিনি। কিশোরী ক্লাবের সদস্য শিল্পী আক্তার (১৭) বলে, ‘তাঁর সঙ্গে কথা বলে আমরা খুব খুশি হয়েছি। আর আসবেন কি না জানতে চাইলে মহাসচিব বলেন, “আমি আবার আসব।”
এরপর বান কি মুন ক্লিনিকের অভ্যন্তরীণ সাজসজ্জা দেখেন, বিভিন্ন কক্ষ ঘুরে দেখেন। কথা বলেন কমিউনিটি গ্রুপের সদস্যদের সঙ্গে।
ক্লিনিক থেকে বেরিয়ে কমিউনিটি ক্লিনিকের সামনে একটি তালি পামগাছের চারা রোপণ করেন মুন। তারপর ছুটে যান মোবারকপুর গ্রামের হাছনা বেগমের (৪৫) উঠানে। উঠানে পাতা মাদুরে বসে কথা বলেন প্রসূতি ও গর্ভবতী মায়েদের সঙ্গে। হাত মেলান সবার সঙ্গে। মায়েরা ভাবতেই পারছিলেন না, এমন একজনের সঙ্গে তাঁরা হাত মেলাচ্ছেন। একসময় সেই শিশুটিকে, যার জন্য তাঁর এই এত দূর আসা, তাকে কোলে তুলে নেন বান কি মুন। এমন এক অচেনা অতিথির কোলে ভ্যাবাচেকা খাওয়া ছাড়া কী আর করার ছিল শিশুটির। শিশুটি জানে না, নিজের অজান্তেই সে এক ঐতিহাসিক ঘটনার অংশ হয়ে আছে।
বান কি মুন এই উঠান বৈঠক থেকে বেরিয়ে সোজা চলে যান হেলিকপ্টারের দিকে। বেলা পৌনে ১২টার দিকে তাঁর হেলিকপ্টারটি আকাশে উড়াল দেয়। বিস্ময়ভরা গ্রামবাসীর চোখের সামনে হেলিকপ্টারটি ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্র হতে হতে একসময় আকাশে ডুব দেয়।
আলোচনায় মোবারকপুর
মৌলভীবাজার জেলার কুলাউড়া উপজেলার টিলাগাঁও ইউনিয়নের পাল্লাকান্দি গ্রামের মো. ওসমান আলীর স্ত্রী পিয়ারুন বেগম (৩৫)। গত ১৭ জুলাই তাঁর প্রসব ব্যথা শুরু হলে ইউনিয়নের স্বাস্থ্য সহকারী রেহানা বেগম এবং এমএনএইচআই প্রকল্পের সেচ্ছাসেবক তেরাবুন বেগম পিয়ারুনকে মোবারকপুর কমিউনিটি ক্লিনিকে নিয়ে আসেন। তাঁরা দুজন আগে থেকেই গর্ভকালীন বিভিন্ন সময়ে তাঁকে দেখে আসছিলেন। কিন্তু স্বামীর অনুপস্থিতিতে পিয়ারুন বেগমের পক্ষে ক্লিনিকে আসার সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। সময় গড়িয়ে যায়। একপর্যায়ে কোনো উপায় না দেখে তিনি (পিয়ারুন বেগম) সম্মতি দিলে তাঁকে মোবারকপুর কমিউনিটি ক্লিনিকে নিয়ে আসা হয়। এরই মধ্যে মুঠোফোনে খবর পেয়ে কুলাউড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা অমিতাভ দে, এমএনএইচআই প্রকল্পের জেলা মাঠ কর্মকর্তা গোলাম মহীউদ্দিন খান, কর্মকর্তা শাহ আলম, কমিউনিটি গ্রুপের সভাপতি রজব আলী, কোষাধ্যক্ষ আবদুল জব্বার প্রমুখ সেখানে উপস্থিত হন। উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্যক্তিগতভাবে প্রয়োজনীয় ওষুধসামগ্রী কিনে আনান। এরপর ডা. অমিতাভ দে’র তত্ত্বাবধানে কোনো ধরনের জটিলতা ছাড়াই স্বাভাবিকভাবে একটি পুত্রসন্তানের জন্ম দেন পিয়ারুন বেগম।
মোবারকপুর রাতারাতি সম্পূর্ণ আলাদা হয়ে ওঠে কমিউনিটি ক্লিনিক ও একটি শিশুর জন্মের সুবাদে। অনেক বড় মানুষজন গাড়ি হাঁকিয়ে ছুটে আসেন মোবারকপুরে। আসেন পিয়ারুন বেগমের বাড়িতেও। গ্রামের মানুষজনের বিস্ময় বাড়ে, যেদিন তাঁরা জানতে পারেন এমন এক লোক তাঁদের গ্রামে আসছেন, যাঁর কথা তাঁরা কখনো কল্পনাও করতে পারেননি।
গ্রামের রাস্তা ঝকঝকে হতে থাকে। মোবারকপুর কমিউনিটি ক্লিনিক নতুন রঙে, আসবাবপত্রে সজ্জিত হতে থাকে। বিদ্যুৎ আসে ক্লিনিকে। প্রতিদিন সরকারি-বেসরকারি কর্মকর্তার আসা-যাওয়ায় প্রাণচাঞ্চল্যে জেগে ওঠে শুধু মোবারকপুরই নয়, আশপাশের গ্রামও। আসেন নিরাপত্তা কর্মকর্তারা। এসএসএফ, পুলিশ ও র্যাব পুরো এলাকা ঘিরে রাখে। মোবারকপুর কমিউনিটি গ্রুপের সভাপতি ও টিলাগাঁও ইউনিয়ন পরিষদের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য আবদুল মালিক বলেন, ‘আমাদের এলাকায় এ রকম একজন লোক আসবেন, এটা আমরা কোনো দিন স্বপ্নেও কল্পনা করিনি। এলাকার এমন কোনো মানুষ নেই যে খুশি হয়নি। আমরা ওয়ার্ডবাসী হিসেবে অত্যন্ত গর্বিত।’
স্মৃতিরা উজ্জ্বল ডানায় ঘুরছে
বান কি মুন চলে গেলেও এখনো তাঁর উপস্থিতি যেন ভুলতে পারছে না মোবারকপুর, পাল্লাকান্দি, বৈদ্যশাসনসহ আশপাশের গ্রামের মানুষ। গ্রামটি এখনো ঝকঝকে, চকচকে। বান কি মুন কোথায় এসেছিলেন, কোথায় বসেছিলেন, তা দেখতে প্রতিদিন মোবারকপুর কমিউনিটি ক্লিনিকে ছুটে আসছে দূরদূরান্তের মানুষ। গত সোমবার (২১ নভেম্বর) মোবারকপুরে গিয়ে দেখা গেছে, এখনো বান কি মুনের কথা মুখে মুখে ফিরছে। এখনো গ্রামটিতে জেগে ওঠা প্রাণের স্পন্দন মিইয়ে যায়নি। মোবারকপুর কমিউনিটি ক্লিনিকের ভূমিদাতা রজব আলী (৮০) বলেন, ‘জাতিসংঘের মহাসচিব আমাদের গ্রামে আসবেন, এটা তো আমরা স্বপ্নেও ভাবিনি। এলাকার মানুষ সে জন্য খুব খুশি। মহাসচিবের সঙ্গে স্বাস্থ্যমন্ত্রী ডা. আ ফ ম রুহুল হক এসেছেন। এঁরা কেউ তো এই গ্রামে আসার লোক না। আমি চাই, এখানে একটা বড় হাসপাতাল হোক। এখানে মানুষ উন্নত সেবা পাবে। হাসপাতালের জন্য আমি আরও জায়গা দিতে রাজি আছি। গরিব মানুষ উন্নত চিকিৎসার জন্য দূরে যেতে পারে না।’
কমিউনিটি ক্লিনিকের কোষাধ্যক্ষ আবদুল জব্বার বলেন, ‘মাত্র এক মিনিট আমাদের সঙ্গে কথা হয়েছে। এই গ্রাম এলাকায় থাকি (থেকে) জাতিসংঘের মহাসচিবের সাথে কথা কওয়া—এটা বহু বড় পাওনা। আমরা কাজ করছি ব্যক্তিগত স্বার্থে না। বিত্তশালীরা শহরে গিয়ে চিকিৎসা করাতে পারেন। কিন্তু গরিব মানুষের পক্ষে সেটা সম্ভব না। আমার ধারণা, বান কি মুন মোবারকপুর আসায় দেশের ১৮ হাজার ক্লিনিকই উপকৃত হবে।’ পাল্লাকান্দি গ্রামের কছিব মিয়া (৫০) বলেন, ‘দেশে বহুত বড় নাম অইছে (হয়েছে) মোবারকপুরের। এজাত বেটাইনতরে (এ রকম লোককে) আমরার এলাকায় আনা কঠিন আছে। ভাগ্যগুণে এই গ্রামে তাঁর আওয়া (আসা)।’
বিস্ময়বালক!
চা-বাগানের মধ্য দিয়ে চলে গেছে কাঁচা সড়ক। সেই সড়ক বেয়ে গত ২১ নভেম্বর সকালে পাল্লাকান্দি গ্রামে পিয়ারুন বেগমের বাড়িতে গিয়ে তাঁকে পাওয়া যায়নি। সঙ্গে ছিলেন মোবারকপুর কমিউনিটি ক্লিনিকের কোষাধ্যক্ষ আবদুল জব্বার। একে-ওকে জিজ্ঞেস করে জানা গেল, পিয়ারুন বেগমের ছেলে ইমরান আলীর ( প্রায় পাঁচ মাস বয়স) শরীর খারাপ। তাঁরা চিকিৎসকের কাছে গেছেন। পাশের একটি বাড়িতে বসে তাঁর অপেক্ষা করি আমরা। কিছুক্ষণের মধ্যেই ছেলেকে কোলে নিয়ে পিয়ারুন বেগম ছুটে আসেন। পিয়ারুন বেগম এ রকম অভ্যাগতদের আসা-যাওয়ায় এখন অভ্যস্ত হয়ে গেছেন। কেমন আছেন জানতে চাইলেই মৃদু হেসে বললেন, ‘ভালা আছি। তবে ছেলেটার শরীর খারাপ। সেদিন (বান কি মুনের আসার দিন) থাকি খুব চাতার (জ্বালাতন করছে)। অনেক মানুষ দেখছে তো।’
পিয়ারুন বেগমের চোখেমুখে তখনো যেন লেগে আছে বান কি মুনের সঙ্গে বৈঠকের রেশ। তাঁর ছেলেকে বান কি মুন ও তাঁর স্ত্রী ইউ সুন তায়েক কোলে নেওয়ার ঘটনায় বিস্ময়ে অভিভূত পিয়ারুন বেগম। গুছিয়ে কথাই বলতে পারছেন না। তিনি বলেন, ‘আমি কোনো দিন কল্পনা করিনি এ রকম কেউ এসে আমার ছেলেকে কোলে তুলে নিবে। জাতিসংঘের মহাসচিব আমার ছেলেকে কোলে নিয়েছেন, এটা ভাবতে আমার খুব ভালা লাগে।’ এটা শুধু তাঁরই ভালো লাগা ও বিস্ময় নয়, তাঁর আশপাশের লোকজনের কাছেও এটা চমক লাগানো ঘটনা। সবার কাছে এখন ইমরান আলী রীতিমতো বিস্ময়বালক! রাতারাতি পুরো গ্রামে সাড়া পড়ে গেছে তাকে ঘিরে।
পিয়ারুন বেগম জানান, তাঁর আরও দুটি সন্তান আছে। দুটোই মেয়ে। এদের জন্ম হয়েছে বাড়িতে। শুধু ইমরান আলীরই জন্ম হলো ক্লিনিকে।








