লেখক: শাইখ সিরাজ
একান্ত সাক্ষাত্কারে এফএও’র উপ মহাপরিচালক মনোজ জুনেজা
মনোজ জুনেজা। জন্মসূত্রে ভারতীয়। পড়াশুনা করেছেন লন্ডন স্কুল অব ইকোনোমিক্স এন্ড পলিটিক্যাল সায়েন্সে অর্থনীতি বিষয়ে। কর্মজীবন শুরু করেন ১৯৮১ সালে লন্ডনের আর্থার এন্ডারসন এন্ড কোম্পানিতে বিজনেস কনসালট্যান্ট ও সিনিয়র অডিটর হিসেবে। ১৯৮৭ সালে তিনি এফএও সদর দপ্তরে যোগদান করেন প্রোগ্রাম এন্ড বাজেট অফিসার হিসেবে। ২০০৫ সালে তিনি এফএও’র কর্মসূচি, বাজেট ও মূল্যায়ন বিভাগের পরিচালক হিসেবে পদোন্নতি পান। বর্তমানে তিনি এফএও’র উপ মহাপরিচালক অপারেশনস হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। একান্ত সাক্ষাত্কারে মনোজ জুনেজা খাদ্য নীতি, পরিকল্পনা ও বিনিয়োগে বাংলাদেশের সাফল্য নিয়ে কথা বলেছেন।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা এফএও’র উপ মহাপরিচালক (অপারেশনস) মনোজ জুনেজা বলেছেন, জাতীয় খাদ্য নীতিমালা, কর্মপরিকল্পনা এবং বিনিয়োগ পরিকল্পনা প্রণয়নের মাধ্যমে বাংলাদেশ ইতোমধ্যে বিরাট সাফল্য দেখিয়েছে। এটি সত্যিই অনেক বড় অর্জন যা অন্য দেশগুলো বাংলাদেশের কাছ থেকে শিখতে পারে। পৃথিবীর বহু উন্নয়নশীল দেশে এই নতুন ধারণাগুলোর প্রয়োজন রয়েছে। মনোজ জুনেজা গত ১৮ থেকে ২১ নভেম্বর বাংলাদেশ সফর করেন। ওই সময়ে তিনি দক্ষিণাঞ্চলে এফএও’র বিভিন্ন প্রকল্প পরিদর্শন করেন এবং সরকারের নীতি নির্ধারকদের সঙ্গে খাদ্য নিরাপত্তা, জলবায়ু পরিবর্তনসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে বৈঠক করেন। নির্ধারিত সফরসূচির বাইরে এক একান্ত সাক্ষাত্কারে বাংলাদেশের বর্তমান খাদ্য নিরাপত্তা পরিস্থিতি, এফএও’র বিভিন্নমুখী সহায়তামূলক প্রকল্প এবং আগামীর উদ্যোগ সম্পর্কে তিনি উপরোক্ত কথা বলেন। জনাব জুনেজা দু’টি প্রকল্প পরিদর্শনের সুবাদে দক্ষিণাঞ্চলের বরগুনা ও বরিশাল জেলায় যান। উপলব্ধি হিসেবে তিনি বলেন, সবুজ ভূখণ্ড যেখানে সুযোগ এবং সম্ভাবনার কোনো কমতি নেই। বলা যায় সেখানকার বেশির ভাগ জমি ভালভাবে কাজে লাগানো হয়েছে। প্রথম যে প্রকল্পটি দেখতে যাই যা বরগুনায়। সেটি আসলে খাদ্য নিরাপত্তা এবং পুষ্টি সংক্রান্ত প্রকল্প। খাদ্য নিরাপত্তা এবং পুষ্টি অর্জনের লক্ষে এটি একটি সমন্বিত পদ্ধতিতে পরিচালিত প্রকল্প। যেহেতু এটি একটি সমন্বিত পদ্ধতিতে পরিচালিত প্রকল্প, তাই এটি সেখানকার জনগোষ্ঠিকে মারাত্মক অপুষ্টি থেকে উত্তরণের রাস্তা খুঁজে দিতে সাহায্য করে। সম্পূরক খাদ্য বা রোগ-নিরাময়ের খাদ্য সেখানে প্রয়োজন। এর মাধ্যমে সেখানকার মানুষ পুষ্টি, শিক্ষা এমনকি বাড়ির উঠানে ফসল চাষের মাধ্যমে নিজেদের উন্নয়ন ঘটাতে পারবে। বিশেষ করে সমাজের সবচেয়ে অবহেলিত অংশ নারীরা তাদের টেকসই উন্নয়নে নিজেরাই উদ্যোগী হতে পারবে। দ্বিতীয় প্রকল্পটি ছিল বরিশালে। জরুরি সাইক্লোন প্রকল্প। যেখানে এফএও মানুষের উন্নয়ন ত্বরান্বিত করার চেষ্টা করছে। বিশেষ করে কৃষি, মত্স্য এবং পশুপালনের মাধ্যমে মানুষ উন্নয়নের পথ খুঁজে পাচ্ছে। জুনেজা বলেন, খাদ্য নিরাপত্তা এবং পুষ্টি সংক্রান্ত ওই প্রকল্পে খুবই ইতিবাচকভাবে জাতিসংঘের বিভিন্ন সংগঠনগুলো সহায়ক হিসেবে যুক্ত রয়েছে। বাংলাদেশে এরকম সহযোগিতার চমত্কার নিদর্শন রয়েছে। বাংলাদেশে এফএও’র কর্মপরিধি নিয়ে প্রশ্ন ছিল তার কাছে। মনোজ জুনেজা বলেন, বাংলাদেশে এফএও’র সহযোগিতা ব্যাপক-বিস্তৃত। নীতি নির্ধারণী ক্ষেত্রে সহযোগিতা এসব জায়গাগুলোর ভেতর অন্যতম। দ্বিতীয় ক্ষেত্রটি প্রথমটির সাথে জড়িত আর তা হল বিনিয়োগ। বাংলাদেশ ইতোমধ্যেই একটি কান্ট্রি ইনভেস্টমেন্ট প্ল্যান (বাংলাদেশ বিনিয়োগ পরিকল্পনা) তৈরি করেছে। এই পরিকল্পনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা হল এটি বিভিন্ন প্রকল্পের একটি সমাবেশ স্থান। এই পরিকল্পনাটি তৈরি হয়েছে এমনভাবে যেখানে নিশ্চিতভাবে ফলাফল আসবে আর যেটি দাতা সংস্থাগুলোকে বিনিয়োগ করতে সাহায্য করবে। তৃতীয় ক্ষেত্রটি হচ্ছে খাদ্য নিরাপত্তা এবং পুষ্টি নিশ্চিতকরণে আমাদের সরাসরি সহযোগিতা। চতুর্থ জায়গাটি হচ্ছে বিভিন্ন দুর্যোগের বিপরীতে আমাদের করণীয়গুলো স্পষ্ট। যেমন পশুস্বাস্থ্য, এভিয়ান ইনফ্লুয়েঞ্জা, অন্যান্য রোগ-বালাই যেমন পিপিআর এবং গবাদিপশুর খুরা রোগ। খাদ্য নিরাপত্তার বিষয়টিও কিন্তু এখানে রয়েছে। আর সবশেষে, জলবায়ু পরিবর্তন এবং প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবস্থাপনার বিষয়টির দিকে আমাদের বিশেষ নজর রয়েছে। বাংলাদেশ একটি মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ দেশ যেখানে খাদ্য নিরাপত্তা এবং ক্ষুধার ওপর জলবায়ু পরিবর্তনের বিশাল প্রভাব পড়তে পারে। মনোজ জুনেজার কাছে প্রশ্ন ছিল, খাদ্য ও কৃষি সংস্থা এই মারাত্মক বিপজ্জনক ইস্যুগুলোকে কীভাবে দেখছে? জবাবে তিনি বলেন, প্রাতিষ্ঠানিক এবং নীতি নির্ধারণী পর্যায়ে বাংলাদেশ সরকারকে আমরা সাহায্য করতে পারি। বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়কেও আমরা সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে পারি। যাতে করে, নীতি নির্ধারণী পর্যায়ে তারা আমাদের সাহায্যের পুরোটা কাজে লাগাতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে সারা পৃথিবীতে বিভিন্ন কাজ হচ্ছে। এসব বিষয়ে আমরা বাংলাদেশের সরকারকে অবশ্যই সাহায্য করতে পারি। কারণ, জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে খাপ খাওয়াতে পারে এমন কৃষি ব্যবস্থার গুরুত্ব অপরিসীম। আমরা নিজেরা এবং বাংলাদেশ সরকার আরও উদ্যোগী হতে পারে নতুন প্রযুক্তিতে বিনিয়োগের ব্যাপারে। নতুন বীজ উদ্ভাবন, বাইরে থেকে আনা কিংবা সম্প্রসারণে আমরা বিনিয়োগ করতে পারি যেগুলো বিভিন্ন প্রাকৃতিক বৈপরীত্য সহনশীল। বিশেষ করে, লবণসহিষ্ণুসহ কয়েকটি জাত উদ্ভাবনের ব্যাপারে বাংলাদেশ ইতোমধ্যেই সাফল্য দেখিয়েছে। মাঠপর্যায়ে যার প্রতিফলন আমি দেখে এসেছি। বাংলাদেশ সফরের অভিজ্ঞতাটি এফএও’র কর্ম পরিকল্পনায় কীভাবে মূল্যায়ন পাবে- এ প্রশ্নের জবাবে মনোজ জুনেজা বলেন, চারটি প্রধান স্তম্ভের আওতায় কাজগুলোকে আমি তুলে ধরার চেষ্টা করব। প্রথমটি অত্যন্ত নিবিড়ভাবে ভাবতে হবে। ধান উত্পাদনে প্রাথমিকভাবে স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সফল হয়েছে। স্বল্প জমিতে আরও বেশি ধানের আবাদ কীভাবে করা যায় সে বিষয়টি নিয়ে অনেক কাজ রয়েছে। দ্বিতীয় স্তম্ভটি হল ফসল বৈচিত্র। ইতোমধ্যে, ফসল বৈচিত্রে বাংলাদেশের দারুণ সব সাফল্য রয়েছে। তৃতীয় বিষয়টি হচ্ছে টেকসই উন্নয়নের পথে হাঁটা। প্রাকৃতিক সম্পদগুলো টেকসইভাবে ব্যবহার করার পদ্ধতিগুলো রপ্ত করাটাও জরুরি যাতে করে নিশ্চিতভাবে খাদ্য উত্পাদন সম্ভব হয়। সবশেষে, জলবায়ুগত কারণে বাংলাদেশ একটি ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হওয়ার কারণে সহনশীলতা বৃদ্ধি করাটাও খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আমি টেকসই উন্নয়নের দিকে বেশি জোর দিতে চাই। বনায়ন এবং পরিবেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতার পাশাপাশি আমি বিশেষ করে খাদ্য নিরাপত্তার বিষয়টিকেও সমান গুরুত্ব দিচ্ছি। যদিও এ ব্যাপারে এফএও কাজ করে চলেছে, তারপরও আমি বিশ্বাস করি এক্ষেত্রে বাংলাদেশ আরও উন্নতি করতে পারবে এবং অবশ্যই এফএও’র তার সহযোগিতা অব্যাহত রাখবে।








