জেএফআর জ্যাকব
একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীন বাংলাদেশ বিনির্মাণে দেশের মানুষের সঙ্গে বিদেশিরাও তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। তাঁদের কেউ এখানে কূটনীতিক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন, কেউ সরাসরি আমাদের মুক্তিযুদ্ধে শরিক হয়েছেন, কেউ স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে এখনো কাজ করে যাচ্ছেন। আবার কেউ সাংবাদিকতা করতে গিয়ে এই দেশটির মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে নিজেদের একাত্ম করে নিয়েছেন। স্বাধীনতার চার দশকের দোরগোড়ায় এসে বাংলাদেশ সম্পর্কে তাঁদের কয়েকজনের পর্যবেক্ষণ ও অনুভূতি নিয়ে আমাদের এই আয়োজন। সেই সঙ্গে দেশ নিয়ে দুই প্রবাসী লেখকের আশার কথা।
বাংলাদেশ রাষ্ট্রে পরিণত হবে যে ভূখণ্ডটি, সেখানকার মানুষের সঙ্গে আমার প্রথম যোগাযোগ হয়েছিল ১৯৪৩ সালে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়। আমার ব্যাটারি (গোলন্দাজ বাহিনী) তখন সড়কপথে বিহার, অবিভক্ত বাংলা হয়ে তৎকালীন বার্মার আরাকানে যাচ্ছিল। দুর্ভিক্ষের নিদারুণ করুণ অবস্থা আমাকে গভীরভাবে স্পর্শ করে। সন্ত্রস্ত হয়ে উঠেছিলাম আমি। যাওয়ার পথে আমাদের সৈনিকদের রেশন অর্ধেক ছেঁটে ক্ষুধার্তদের মাঝে বণ্টনে আমরা ব্রত হই। ঢাকার বাইরে আমাদের ফিল্ড কিচেন (ভ্রাম্যমাণ ক্যানটিন) বসেছে। আমরা দেখছি নিরন্ন মানুষের দীর্ঘ সারি। তাই জনগণের মধ্যে খাদ্য বণ্টন করে আমরা তাদের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছি। প্রতিজনের জন্য বরাদ্দ—দুটো চাপাতি আর ডাল/ভাজি শেষ হয়ে যেত দ্রুতই। তখন তাদের চোখ-মুখে ফুটে ওঠা হতাশা প্রত্যক্ষ করা আমার জন্য দারুণ কষ্টের ব্যাপার ছিল। সে জন্য বণ্টন করার জন্য আরও খাবার জোগাড়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম আমি।
আমার মনে আছে, ঢাকার সীমান্তে একটি ফেরিঘাটের কাছে সেনাবাহিনীর একটি সরবরাহ ডিপো ছিল। ডিপোর দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার সঙ্গে দেখা করলাম। তাঁকে বললাম, তিনি যেন আমার ব্যাটারি, আমার লোকজনের জন্য এক সপ্তাহের রেশন দেন। ওই খাবার যে এলাকার অনাহারী লোকজনের ভেতর বিলি করতে চাই, সে কথা বলিনি তাকে। তিনি রেশন দিতে অস্বীকার করলেন। উত্তপ্ত বাগিবতণ্ডা হলো। আমি নাছোড়বান্দা, লেগে রইলাম। শেষে জানতে চাইলেন রেশনের জন্য আমি স্বাক্ষর দিতে রাজি আছি কি না; বললাম, আছি। তারপর তিন কপি করে ভাউচার বের করলেন। সই করে দিলাম আমি। সামরিক অভিযান এলাকায় প্রবেশ করতে যাচ্ছিলাম আমরা, এখানে শান্তিকালীনের মতো হিসাব-নিকাশের অবকাশ ছিল না। তা ছাড়া ইতিপূর্বে সই করা ভাউচার নিয়ে কোনো প্রশ্ন ওঠার সুযোগও ছিল না। আমরা সেনাশিবির এলাকায় ২০০ সেনার এক সপ্তাহের বরাদ্দ খাবার চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের উপকণ্ঠের অভাবী লোকদের ভেতর বিলি করে দিয়েছিলাম। তারপর আরাকানে চলে যাই। অভুক্ত লোকদের ভেতর বিলি করা এক সপ্তাহের সেই অননুমোদিত রসদ তোলার ব্যাপারে আর কোনো কিছু শুনতে পাইনি।
ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের জনগণের সঙ্গে আবার সম্পর্কিত হওয়ার আগে বেশ একটা দীর্ঘ সময় কেটে যায়। সম্ভবত ১৯৬৯ সালে ফোর্ট উইলিয়ামে পৌঁছাই আমি। পূর্ব পাকিস্তানে তখন দ্রুত চলছে ঘটনাপ্রবাহ। শেখ মুজিব ১৯৬৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে লাহোরে ঘোষিত তাঁর ছয় দফা দাবির ব্যাপারে অনড় ছিলেন; ১৯৭০ সালে এক প্রলয়ংকরী জলোচ্ছ্বাস হয়, পূর্ব পাকিস্তানের সরকার কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণে ব্যর্থ হয়, দুর্ভোগ ছিল চরম, কিন্তু কোনো রকম প্রতিকারের ব্যবস্থা ছিল না বললেই চলে। এটা ছিল জনগণের ভোগান্তির প্রতি পূর্ব পাকিস্তান সরকারের বৈষম্য ও নিস্পৃহতার একটা নজির। পূর্ব পাকিস্তান সরকারের এমন নিষ্ঠুরতায় পশ্চিম বঙ্গের জনগণ শঙ্কিত হয়ে উঠেছিল।
১৯৭০ সালে অনুষ্ঠিত নির্বাচন ১৬০টি আসনে (সংরক্ষিত ৭টিসহ মোট ১৬৭টি আসন) বিজয়ের ভেতর দিয়ে শেখ মুজিবকে ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠতা এনে দেয়, পূর্ব পাকিস্তানে মাত্র দুটি আসন বাদে বাকি সব আসন লাভ করেন তিনি। ভুট্টোর পাকিস্তান পিপলস পার্টি পশ্চিম পাকিস্তানে ৮১টি আসন লাভ করে। পশ্চিম পাকিস্তানের জনগণ শেখ মুজিবকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেখতে চায়নি। ইয়াহিয়া খান মার্চে জাতীয় পরিষদের অধিবেশন হবে বলে ঘোষণা দিয়েছিলেন, কিন্তু পরে তা বাতিল করা হয়। গোটা পূর্ব পাকিস্তানে হরতাল ও প্রতিরোধ পালন করা হয়। সাহেবজাদা ইয়াকুব খানকেপূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর নিযুক্ত করা হয়। ইয়াকুব ছিলেন জনগণের প্রতি সহানুভূতিসম্পন্ন ও কোমল মনের মানুষ। রাওয়ালপিন্ডির তা মনঃপূত হয়নি। এক মাস পর ‘কসাই’ টিক্কা খানকে ইয়াকুবের স্থলাভিষিক্ত করা হয়। ঘটনাক্রমে ১৯৪৭ সালের আগস্ট মাসে মেজর টিক্কা খান গানারি স্টাফ কোর্সের একজন ছাত্র ছিলেন, দিওলালিতে আমিও সেই প্রশিক্ষণে অংশ নিয়েছিলাম। পাকিস্তানের অন্য কর্মকর্তাদের সঙ্গে পাকিস্তানে ফিরে যান তিনি। মেজর টিক্কা খানের কথা অল্প অল্প মনে আছে আমার। তখন তাঁকে আমার তেমন একটা আকর্ষণীয় ঠেকেনি।
পূর্ব পাকিস্তান পরিস্থিতিতে ভারতের উদ্বিগ্ন সরকার সে দেশের ওপর বিমান চলাচল স্থগিত ঘোষণা করে। ২৩ মার্চ পাকিস্তান দিবসে সারা পূর্ব পাকিস্তানে বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করা হয় । ২৫ মার্চের সন্ধ্যায় কলম্বো হয়ে পাকিস্তানে ফিরে যান ইয়াহিয়া খান। ২৫ মার্চ রাত একটায় ক্র্যাকডাউন ‘অপারেশন সার্চলাইট’ শুরু করার নির্দেশ দেন টিক্কা খান। শেখ মুজিব বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করে বিবৃতি দেন এবং জনগণকে শেষ পাকিস্তানি সেনাটিকে বিতাড়ন না করা পর্যন্ত যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান।
২৫ মার্চ রাত একটায় শেখ মুজিবকে তাঁর বাসভবন থেকে গ্রেপ্তার করার আনুমানিক তিন দিন পর করাচিতে নিয়ে যাওয়া হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ট্যাংক অধিনায়কদের হুকুম আমি বেতারে অস্পষ্টভাবে শুনতে পাচ্ছিলাম: ‘বামে যাও। জানালা খোলো, চালাও গুলি,’ ইত্যাদি। নির্মমভাবে প্রতিরোধ দমন করা হয়। বেশির ভাগ বাংলাদেশি নেতা পালিয়ে ভারতে চলে যান। শরণার্থীদের আগমন শুরু হয়। করুণ দৃশ্য ছিল সেটা। সামান্য যা কিছু সম্বল ছিল তা নিয়েই হাজির হচ্ছিল তারা। ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট ভারতে চলে আসে। এ সময় সীমান্তে গিয়ে ভারতে প্রবেশের চেষ্টা করছিল তারা। এ সময় তাদের সাহায্য করার চেষ্টা করি। ভারতে ওদের চলাফেরা নজরদারি করতে বেনাপোল সীমান্তে একটি পদাতিক ব্যাটালিয়ন নিয়োগ দিই আমি। পূর্ব পাকিস্তানের অভ্যন্তরেই শুল্ক চৌকিতে তাজউদ্দীন আহমদের ব্রিটিশ পার্লামেন্ট সদস্য গ্রিফিথসের সঙ্গে আলোচনায় বসার কথা ছিল। তখন পাকিস্তানি অস্ত্র থেকে ওই এলাকায় গুলিবর্ষণ হচ্ছিল। আমি তাজউদ্দীনকে শুল্ক-চৌকি ত্যাগ করার অনুরোধ জানাই। এখানে বাংলাদেশি পতাকা উড়ছিল। আলোচনার পর আমরা তাজউদ্দীনকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিয়ে যাই। পাকিস্তানি বাহিনী এগিয়ে আসছিল। বাংলাদেশি পতাকা নামানোর তৎপরতায় নিয়োজিত পাকিস্তানিদের নিশানা করে গুলি করার নির্দেশ দিয়েছিলাম আমি। পাকিস্তানিদের আমরা পতাকা নামাতে দিইনি। আত্মসমর্পণ পর্যন্ত সেই পতাকা কিন্তু উড্ডীন ছিল।
মার্চের শেষ নাগাদ বেশ কয়েকজন বাংলাদেশি নেতা এসে পৌঁছান। তাঁদের ভেতর উল্লেখযোগ্য হচ্ছেন তাজউদ্দীন আহমদ, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, কামরুজ্জামান, মনসুর আলী, কর্নেল ওসমানী এবং উইং কমান্ডার এ. কে. খন্দকার। একটি প্রবাসী সরকার গঠন করা হয়। ৮ থিয়েটার রোডে তাঁদের একটি বাংলো বরাদ্দ দিই আমরা। অবিলম্বে তাঁরা কাজ শুরু করেন।
মুক্তিবাহিনী গঠন-প্রক্রিয়া শুরু হয়, প্রাথমিকভাবে আটটি শিবিরের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। সেক্টর কমান্ডারদের মনোনয়ন দেওয়া হয়। সেক্টর কমান্ডাররা অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে তাঁদের অধীন যোদ্ধাদের পরিচালনা করেন। মুক্তিবাহিনী ও ইস্ট বেঙ্গল ব্যাটালিয়নগুলো মুক্তিসংগ্রামে অধিক গুরুত্বপূর্ণ ও নিষ্পত্তিকারক ভূমিকা রাখে। তারা সর্বত্র পাকিস্তানি বাহিনীর ওপর হামলা চালায় ও অবকাঠামোর মারাত্মক ক্ষতি সাধন করে। তারা এমন অবস্থা সৃষ্টি করেছিল, যার ফলে পাকিস্তানি বাহিনীর মনোবল সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে। পাকিস্তানের পরাজয় ও বাংলাদেশ সৃষ্টিতে তাদের যথোচিত অবদান স্বীকার করতেই হবে।
৪ ডিসেম্বর থেকে ঝটিকা আক্রমণের সূচনা করা হয়। ১৪ ডিসেম্বর নিয়াজি জাতিসংঘের অধীনে যুদ্ধবিরতির আবেদন করেন ও জাতিসংঘের হাতে সরকারের দায়িত্ব তুলে দেওয়ার কথা বলেন। ১৫ ডিসেম্বর এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন ভুট্টো, তিনি যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার শপথ নিয়েছিলেন। আমি আত্মসমপর্ণের দলিলের খসড়া তৈরি করি। ১৬ ডিসেম্বর ঢাকার জনগণের সামনে নিয়াজিকে শর্তহীন আত্মসমর্পণে বাধ্য করি। ইতিহাসে এর আর নজির নেই। তিনি যাঁদের প্রতি নিষ্ঠুর আচরণ করেছিলেন, তাঁদেরই মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছি তাঁকে। পাকিস্তানি বাহিনীর নিষ্ঠুরতার বর্ণনা বাংলাদেশে যথার্থভাবে নথিবদ্ধ রয়েছে। প্রস্তাব ছিল যুদ্ধবিরতির। কিন্তু মাত্র চার ঘণ্টার ব্যবধানে সেই যুদ্ধবিরতি রূপান্তরিত হয়েছিল পৃথিবীর একমাত্র শর্তহীন প্রকাশ্য আত্মসমর্পণে। হামুুদুর রহমান কমিশন নিয়াজিকে প্রশ্ন করেছিল, ‘জেনারেল, ঢাকার আপনার অধীনে ২৬ হাজার সেনা ছিল, আর ভারতীয়দের সংখ্যা ছিল কয়েক হাজারের মতো, চাইলে আরও অন্তত দুই সপ্তাহ লড়াই চালিয়ে যেতে পারতেন। জাতিসংঘের সভা চলছিল বলে আপনি আর একটি দিন যুদ্ধ অব্যাহত রাখলেই পিছু হটতে বাধ্য হতো ভারতীয়রা; কেন আপনি গ্লানিকর শর্তহীন আত্মসমর্পণ মেনে নিলেন?’ নিয়াজি জবাব দিয়েছিলেন, জেনারেল জ্যাকবের কারণে এমনটি করতে বাধ্য হয়েছেন তিনি, তিনি তাঁকে ব্ল্যাকমেইল করে আত্মসমর্পণ করিয়েছেন।’
বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্ম ঘটে। ২০০৮ সালের মার্চে বাংলাদেশ সেনাপ্রধানের নিমন্ত্রণ লাভ আমাদের জন্য বিরাট সম্মানের ব্যাপার ছিল। বাংলাদেশের মানুষের কাছে ফিরে আসা আমাদের জন্য সব সময় গৌরবের বিষয়। মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে যুদ্ধে অংশ নিতে পারা আমাদের জন্য বড় গর্বের। বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের ৩৭তম বার্ষিকী ছিল সেটা। সেই সফরের আয়োজন করায় সবার উদ্দেশে আমি কৃতজ্ঞতা জানাই। স্বাধীনতাসংগ্রামের সহযোদ্ধারা আমাদের খুবই আন্তরিকতার সঙ্গে স্বাগত জানান। সেনাবাহিনী আমাদের যে অভ্যর্থনা দিয়েছে, সেটা ছিল উদ্দীপনাময়। ভারতীয় অভিজ্ঞ সৈনিক, মুক্তিযোদ্ধা ও সেক্টর কমান্ডারদের মধ্যে ভাববিনিময় হয়েছিল। আমাদের প্রতিনিধিদলে আমরা এগারোজন ছিলাম। সবার স্মৃতিতে মুক্তিযুদ্ধ ছিল উজ্জ্বল। সেক্টর কমান্ডারস ফোরামের নেতারা এবং বিভিন্ন সেক্টরের সাব-কমান্ডারসহ মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে আমরা মিলিত হই।
সত্যি বলতে কি এত বেশিসংখ্যক সহযোদ্ধার সঙ্গে আবার দেখা হওয়াটা ছিল বিরাট সম্মানের ব্যাপার। মুক্তিযোদ্ধা ও ইস্ট বেঙ্গল ব্যাটালিয়নের অসাধারণ নৈপুণ্য ও নির্ধারক ভূমিকার স্মৃতিচারণা করেছি আমরা, অভিজ্ঞতা বিনিময় করেছি। এতগুলো বছর পর অনেককে দেখেছিলাম। কালপরিক্রমায় অনেকের চেহারা, নাম ভুলে গেছি। কিন্তু যুদ্ধকালীন তাঁদের অবদানের কথা ভুলিনি। তাঁদের সঙ্গে বেনাপোল সীমান্ত, ক্যাম্পে, ক্যাম্পের বাইরে অসংখ্যবার দেখা হয়েছে। যুদ্ধের পরিকল্পনা নিয়ে কত শত আলোচনা করেছি। ঢাকা সফরকালে এয়ার ভাইস মার্শাল এ. কে. খন্দকারের সঙ্গে আলাপচারিতা আমার কাছে সবচেয়ে স্মরণীয় ব্যাপার ছিল। সেক্টর কমান্ডার এবং বিশেষ করে বাংলাদেশের মুক্তির লক্ষ্যে পরিচালিত সংগ্রামে তাঁর কঠোর পরিশ্রম ছিল অনবদ্য।
আমাদের সফর নিয়ে বাংলাদেশের গণমাধ্যমগুলো এই পুনর্মিলনীর অনেক তারিফ করেছে। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর ছিল অনন্য। জেনারেল নিয়াজির আত্মসমর্পণের দলিল স্বাক্ষরের স্থান দেখতে গিয়েছিলাম, যেখানে ঢাকার জনগণের সামনে ৯৩ হাজার সৈনিকসহ তিনি ভারত-বাংলাদেশ যৌথ বাহিনীর কাছে শর্তহীন আত্মসমর্পণ করেছিলেন; এয়ার ভাইস মার্শাল খন্দকার সেই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
বাংলাদেশে সশস্ত্র বাহিনীর দক্ষতা ও আন্তরিকতা এবং ১৯৭১ সালের পর থেকে বাংলাদেশের অব্যাহত বিকাশে আমি দারুণ অভিভূত হয়েছি।
বাংলাদেশ একটি মহান দেশ, এবং এ দেশটি আঞ্চলিক পরাশক্তিতে পরিণত হওয়ার পথে ভালোভাবেই অগ্রসর হচ্ছে।
ভবিষ্যতের গর্ভে বাংলাদেশের জন্য কী অপেক্ষা করছে বলতে হলে আমি বিচক্ষণ নেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে একটি প্রাণবন্ত জাতি ও দ্রুত বর্ধিষ্ণু অর্থনীতি দেখতে পাই। বাংলাদেশ একটি শক্তিশালী জাতি হিসেবে আবির্ভূত হয়ে ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশ এখন বিশ্বের ৪৮তম অর্থনৈতিক শক্তি; অন্যদের অতিক্রম করে যেতে দ্রুত অগ্রসর হচ্ছে। বাংলাদেশের জনগণ সাহসী, কর্মঠ ও পরিশ্রমী; অতীতে কৃষি, বিশেষ করে ধান ও পাটভিত্তিক অর্থনীতি শিল্প ও অবকাঠামোগত ক্ষেত্রে বিকশিত হচ্ছে। বাংলাদেশ টেক্সটাইল ও নিটওয়্যারে প্রতিবেশী ভারতকে পেছনে ফেলে প্রধান রপ্তানিকারী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। সমৃদ্ধ হয়ে উঠছে পাট ও চামড়াশিল্প। তেল ও গ্যাসের অপর্যাপ্ত মজুদ থাকলেও প্রচুর কয়লা মজুদ রয়েছে। কয়লা থেকে শিল্প ও বসতবাড়ির প্রয়োজনীয় শক্তি উৎপাদিত হতে পারে। অবকাঠামোগত উন্নয়নের জন্য নতুন কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। সড়ক, সেতু, বন্দর ও রেলপথের কাজ ত্বরান্বিত করার লক্ষ্যে বাংলাদেশ প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিচ্ছে। উত্তরবঙ্গ, মেঘালয়, ত্রিপুরা ও মিয়ানমারকে প্রাচীন আরাকান রোড বরাবর সংযুক্ত করার লক্ষ্যে সড়ক নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। বাংলাদেশ তার সমুদ্র সম্পদ প্রসারিত করছে। ভারত মহাসাগরে নিজের অস্তিত্ব তুলে ধরতেও সে অদম্য। বাংলাদেশের সুপ্রশিক্ষিত একটি সেনাবাহিনী রয়েছে। জাতিসংঘের শান্তি কার্যক্রমে সেনাবাহিনী উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছে।
ভাষান্তর: শওকত হোসেন
জেনারেল জেএফআর জ্যাকব: ১৯৭১-এ ভারতীয় সেনাবাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের উপপ্রধান, সাবেক গভর্নর, পাঞ্জাব ও গোয়া, ভারতl









