পিয়েরে ল্যান্ডেল-মিলস: বাংলাদেশে বিশ্বব্যাংকের সাবেক আবাসিক প্রতিনিধি
বিশেষ সংখ্যা প্রকাশের মধ্য দিয়ে প্রথম আলো তার ১২ বছরের সাফল্য উদ্যাপন করতে যাচ্ছে। এ আয়োজনে যুক্ত হতে পেরে আমি খুব আনন্দিত। নাগরিক স্বাধীনতা রক্ষা এবং সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করার চাবিকাঠি হচ্ছে একটি মুক্ত, সৎ ও নির্ভীক সংবাদমাধ্যম। বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো একটি বড় ধরনের অর্থনৈতিক, সামাজিক, সর্বোপরি রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন দেশের জন্য একটি সক্রিয় ও স্বাধীন সংবাদমাধ্যম অবশ্যপ্রয়োজনীয়। প্রথম আলো তার জ্বলজ্বলে উদাহরণ।
আগামী বছর বাংলাদেশ ৪০তম স্বাধীনতা দিবস উদ্যাপন করবে। এই এতগুলো বছরে কী কী সাফল্য অর্জিত হয়েছে, একটু স্থিত হয়ে সেদিকে একবার দৃষ্টি নিবদ্ধ করার এটাই মোক্ষম সময়। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ নামের এই দেশটি গৃহযুদ্ধের ভস্ম থেকে পৌরাণিক ফিনিক্স পাখির মতো উত্থিত হয়—জন্ম হয় লুটপাটে নিঃস্ব কিন্তু আশায় পূর্ণ এক নতুন দেশের। একের পর এক বিশ্বাসভঙ্গের শিকার হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশিরা গুটি গুটি পায়ে তাদের অর্থনীতিকে পুনর্গঠন করেছে। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ গত চার দশকে বিশ্বের অন্যান্য স্বল্পোন্নত দেশের তুলনায় মাথাপিছু আয়ের হার অনেক দ্রুত বাড়াতে সক্ষম হয়েছে। এ ছাড়া দেশটি সামাজিক নির্দেশনা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও নাটকীয় অগ্রগতি অর্জন করেছে। নারীশিক্ষা ও নারীর সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিত করার বিষয়েও দ্রুত অগ্রগতি অর্জন করছে দেশটি। দেশটিতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ খনিজ ও তেলসম্পদ না থাকা সত্ত্বেও তার অগ্রগতি নিঃসন্দেহে অবাক করার মতো।
আমার এক গবেষক সহকর্মীর অনুসন্ধানে এসব সাফল্যের চিত্র সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে। আমার ওই সহকর্মী তাঁর গবেষণার কাজে বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের একটি গ্রামে ১৯৭৭ সালে একবার এবং ১৯৯৭ সালে আরেকবার গিয়েছিলেন। সত্তরের দশকের মাঝামাঝিতে তিনি যখন ওই গ্রামে যান, সে সময় ওই গ্রামের মানুষ ছিল চরম দরিদ্র। সেখানকার বেশির ভাগ মানুষই জুতা-স্যান্ডেল পায়ে দিত না। পুরুষেরা বছরে একটা নতুন লুঙ্গি কিনতে পারত। মেয়েদের কদাচিৎ বাড়ির বাইরে দেখা যেত। জমিতে বছরে ফসল হতো মাত্র একবার। ফলে দু-মুঠো খাবারের জন্য নামমাত্র মজুরিতে ‘মৌসুমি চাকরি’র জন্য তাদের বাধ্য হয়ে সিলেট শহরে আসতে হতো। ওই গ্রামটি শহর থেকে এত দূরে যে, খানিকটা পায়ে হেঁটে এবং খানিকটা নৌকায় চড়ে তাদের শহরে পৌঁছাতে দুই দিন লেগে যেত।
নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝিতে ঠিক একই গ্রামে আবার গিয়ে ওই গবেষক দেখলেন, সেখানকার অবস্থা পুরোপুরি বদলে গেছে। সেটা তখন আর বিচ্ছিন্ন এলাকা ছিল না। তিনি নির্বিঘ্নে গাড়ি চালিয়ে সেখানে পৌঁছাতে পেরেছিলেন। এবার তিনি সেখানে ছোট ছোট শিশুর পায়েও জুতা-স্যান্ডেল দেখলেন। স্থানীয় সবার পরনে বেশ ভালো কাপড়চোপড় ছিল। মেয়েরা সবার সামনে তাঁকে হেসে অভ্যর্থনা জানাল। সে গ্রামের কৃষকেরা এখন একই জমিতে বছরে তিনবার ফসল ফলিয়ে নিজেদের ভাগ্য ফিরিয়েছেন। আমার ওই গবেষক সহকর্মীর অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সেখানকার মানুষের গড় আয়ু ১৫ বছর বেড়েছে এবং নবজাতক ও প্রসূতি মৃত্যুর হার অর্ধেকেরও বেশি কমেছে। নাটকীয়ভাবে জন্মহার হ্রাস পাওয়ায় শিশুদের প্রতি তাদের অভিভাবকদের পক্ষে বেশি যত্ন নেওয়া সম্ভব হচ্ছে। আমার মনে হয়, ওই গবেষক যদি এখন আবার সেই গ্রামে যান, তাহলে তিনি দেখবেন, সেখানকার অবস্থা আরও অনেক ভালো, যদিও এই বিশাল পরিবর্তনশীল অবস্থার মধ্য দিয়ে যারা জীবন যাপন করছে, তারা নিজেরাই সে পরিবর্তনকে লক্ষ করতে পারছে না।
বিদেশি বা বহিরাগত পর্যবেক্ষকদের কাছে সবচেয়ে যে বিষয়টি বিস্ময়কর—সেটি হলো অতলস্পর্শী প্রশাসনিক সমস্যা, সত্তরের দশকের দিগ্ভ্রান্ত জাতীয়করণ, তৎপরবর্তী আশির দশকের সামরিক শাসন এবং তার পরের টানা দুই দশক বিভক্তি ও হানাহানির ‘গণতন্ত্র’ চর্চা (যেখানে প্রতিটি নির্বাচনের পর বিজয়ীরা ক্ষমতাকে স্বার্থসিদ্ধির উপায় হিসেবে মনে করেছে এবং সংসদীয় সরকারের মৌলিক নীতিকে ন্যূনতম সম্মান প্রদর্শন করতে অস্বীকার করেছে) সত্ত্বেও এ দেশের মানুষের পক্ষে অগ্রগতির এ পর্যায়ে আসা সম্ভব হয়েছে। মোটেও অবাক করার মতো বিষয় নয় যে, ভোটাররা কোনো রকম ব্যত্যয় না ঘটিয়ে প্রতিবারই ক্ষমতাসীন দলকে প্রত্যাখ্যান করছে।
একটি দুর্নীতিবাজ, অযোগ্য ও স্বার্থপর শাসকশ্রেণীর কারণে খোঁড়া হয়ে যাওয়া বাংলাদেশের সুশাসনের সূচক যখন ক্রমশ বিশ্বব্যাংকের লিগ টেবিলের একেবারে তলার কাছাকাছি এসে পৌঁছেছে, যখন তাকে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের দুর্নীতির তালিকার প্রথম দিকে দেখা যাচ্ছে, তখনো সে গড় উন্নয়নমাত্রা অর্জন করতে সক্ষম হচ্ছে। এই বৈপরীত্যকে কীভাবে ব্যাখ্যা করা যায়? অনেক অর্থনীতিবিদ ও পণ্ডিত এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে গলদঘর্ম হয়েছেন।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের যুক্তি হলো, সমাজতান্ত্রিক পরিকল্পনার মলিন যুগ শেষে মূলত বাজার-অর্থনীতিকে আলিঙ্গন করার মাধ্যমে কয়েক বছর ধরে বেসরকারি শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার অনুমতি দেওয়ায় বাংলাদেশ তুলনামূলক ভালো অর্থনৈতিক অবস্থানে আসতে পেরেছে। গত কয়েক বছরে এ দেশের অর্থমন্ত্রীরা বেশির ভাগই ছিলেন দূরদর্শী, তাঁরা খুব বেশি বিদেশি ঋণ আনাকে অনুমোদন দেননি।
কিছু সমাজবিজ্ঞানী শিক্ষা, সাক্ষরতা, স্বাস্থ্য ও পুষ্টি খাতে বাংলাদেশের এই অগ্রগতির জন্য দেশের প্রধান প্রধান এনজিওর গতিশীল কার্যক্রম এবং উদ্যোগ বহুলাংশে ভূমিকা রেখেছে বলে মত দিয়েছেন। সত্যি বলতে কি, কিছু ভুল-ত্রুটি থাকলেও বিগত সরকারগুলো উন্নয়ন-সহযোগীদের জোরালো সমর্থন নিয়ে কয়েক বছর ধরে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও গ্রামীণ অবকাঠামো খাতে যথেষ্ট আর্থিক বরাদ্দ দিয়েছে। এ ছাড়া এনজিওগুলোকে মোটামুটি স্বাধীনভাবে কাজ করতে দেওয়ায় সরকারেরও কৃতিত্ব প্রাপ্য।
আমার ব্যক্তিগত মত হলো, অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ। তারা বারবার উদ্যম ও কষ্টসহিষ্ণুতার পরিচয় দিয়েছে। নিজেদের উন্নতির জন্য তারা অমানুষিক পরিশ্রম করেছে। কিন্তু রাজনীতিকেরা তাদের হতাশ করেছেন।
জাতীয় সমস্যা সমাধানে সঠিক ও দূরদর্শী নীতি গ্রহণ করে সমন্বিতভাবে অগ্রসর হলে বাংলাদেশ আরও অনেক দ্রুত; এমনকি চীনের মতো দ্রুতগতিতে উঠে আসতে পারত। অথচ তা না করে বিগত সরকারগুলো ক্ষমতাসীন অভিজাত শ্রেণী এবং সরকারের অনুগত আমলাদের সংকীর্ণ স্বার্থ রক্ষা করেছে। এ কারণে বিদ্যুৎ খাতে ভয়াবহ বিপর্যয় নেমে এসেছে, বন্দরব্যবস্থা এতটাই অকার্যকর হয়ে পড়েছে যে, বন্দর খাতে প্রতিবছর কয়েক শ কোটি ডলার ক্ষতি হচ্ছে, রাজনীতিক ও আমলারা তাঁদের নিজেদের স্বার্থ উদ্ধারের জন্য টেলিকমিউনিকেশন খাতে এমন সব নীতি প্রণয়ন করে রেখেছেন, যার কারণে ডিজিটাল যুগে ঢোকার মুখেই বাংলাদেশকে বাধার মুখে পড়তে হচ্ছে, সরকারি চাকরিবাকরির ক্ষেত্রে সাংঘাতিক অব্যবস্থাপনা চলছে, সরকারি শিল্প খাত সরকারি কোষাগারকে নিংড়ে নিচ্ছে এবং এখনো বেসরকারি উদ্যোগের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। মোদ্দা কথা, সরকারের ব্যর্থতার তালিকা অনেক দীর্ঘ।
আমার স্পষ্ট মনে আছে, ১৯৯৪ সালে আমি বিশ্বব্যাংক অফিসের প্রধান হিসেবে যোগ দেওয়ার প্রথম মাসেই উপকূলীয় এলাকার একটি প্রতিনিধিদল আমার কাছে একটি অভিযোগ নিয়ে এসেছিল। তাদের অভিযোগ ছিল, বিশ্বব্যাংকের সহযোগিতায় উপকূলে শুরু হওয়া ‘ফ্লাড অ্যাকশন প্ল্যান’ নামের বন্যা প্রতিরোধ পরিকল্পগুনা স্থানীয় গ্রামবাসীর জীবন দুর্বিষহ করে তুলছে। প্রকল্পের কারণে তাদের যারপরনাই ক্ষতি হচ্ছে। সম্পূর্ণ মহৎ উদ্দেশ্যে সরকারের সমর্থন এবং দাতা সংস্থাগুলোর কর্মকর্তাদের সহযোগিতা নিয়ে উচ্চাকাঙ্ক্ষী প্রকৌশলীরা সেখানে ওই বিশাল প্রকল্প শুরু করেছিলেন। তবে প্রকল্প শুরু করার সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে স্থানীয় লোকদের খুব কমই সুযোগ দেওয়া হয়েছে। অথচ জনকল্যাণমূলক কাজের বিষয়ে তাদের মতামতের ব্যাপক প্রভাব রয়েছে। যা-ই হোক, সৌভাগ্যক্রমে শেষ পর্যন্ত কায়েমি স্বার্থবাদীদের উপেক্ষা করে আমরা জনগণের কাছে অগ্রহণযোগ্য ওই বিশাল প্রকল্পের কাজ বন্ধ করতে পেরেছিলাম। এই অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে জনগণের কাছে সরকার ও দাতাগোষ্ঠীর আরও বেশি জবাবদিহি হওয়ার প্রয়োজনীয়তা প্রমাণিত হয়েছে।
উন্নয়ন বিশেষজ্ঞদের কাছে দিন দিন দুটো মৌলিক ধারণার গ্রহণযোগ্যতা বাড়ছে, প্রথমত, জীবনযাত্রার মান দ্রুত উন্নত ও টেকসই করার ক্ষেত্রে সুশাসন কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করে। দ্বিতীয়ত, যেখানে ক্ষমতাসীনেরা জনগণের কথা শুনতে বাধ্য, সেখানকার নাগরিকেরা যদি সুনির্দিষ্টভাবে সরকারের কাছে তাদের দাবি তুলে ধরে, তাহলেই সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। সুশাসন বাইরে থেকে কখনো চাপিয়ে দেওয়া যায় না; কোনো ক্ষেত্রে সংস্কার আনার জন্য রাজনীতিবিদদের ওপর দেশের বাইরে থেকে নয়, বরং সমাজের ভেতর থেকে চাপ আসতে হবে।
বাংলাদেশে এমনটি কীভাবে ঘটবে? গত ২০ বছরে বেশ কিছু ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এগিয়ে যাওয়ার বদলে পিছিয়ে গেছে। দেশের দুই প্রধান রাজনৈতিক দলের চরম বিবাদ এবং হানাহানিমূলক নীতির কারণে বাংলাদেশ দিন দিন মেরুকৃত দুটি বিভক্ত সমাজে পরিণত হচ্ছে। নব্বইয়ের দশকে বাংলাদেশে একটিমাত্র সরকারি প্রতিষ্ঠানকে তার সততার জন্য সর্বমহলে সম্মান করা হতো। সেটি হলো সুপ্রিম কোর্ট। ১৯৯৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে যখন সমগ্র দেশবাসীর কাছে গ্রহণযোগ্য ও আস্থাশীল একজন মানুষের প্রয়োজন দেখা দিল, তখন জনগণ সুপ্রিম কোর্টের একজন সর্বজনশ্রদ্ধেয় অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিকে বেছে নিয়েছিল।
কিন্তু আজ সুপ্রিম কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিদের ওপর আগের মতো জনগণের আস্থা নেই। এখন ক্ষমতার বিবাদের মধ্যে আদালতকে নিয়ে টানাহেঁচড়া হচ্ছে। ফলে কুলীন রাজনীতিকেরা বিচারব্যবস্থা সম্পর্কে জনগণের স্বচ্ছ ধারণায়ও ঘুণ ধরাতে সক্ষম হয়েছেন। বিচারব্যবস্থার প্রতি জনগণের অনাস্থার এই জোয়ারকে এখনই থামিয়ে দিতে হবে। আর তা নিশ্চিত করতে হলে একটি স্বাধীন বিচার কমিশন বিচারক হিসেবে এমন সব লোককে নিয়োগ দেবে, যাঁদের আইনি দক্ষতা, নিরপেক্ষ রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং সততা হবে প্রশ্নাতীত।
জবাবদিহিমূলক সরকার প্রতিষ্ঠার আরেকটি মূল উপাদান হলো জনগণের তথ্য অধিকার নিশ্চিত করা। ঐতিহাসিকভাবেই সারা বিশ্বে যখনই যারা ক্ষমতায় এসেছে, তারা জনগণকে তাদের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে অন্ধকারে রাখার চেষ্টা করেছে। কারণ এটা করতে পারলে সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের পক্ষে রাজনীতিক ও আমলাদের জবাবদিহি করা কঠিন হয়ে পড়ে। এ ক্ষেত্রে ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হয়েছে। ওই মাসে ২০০৮ সালের আরটিআই অধ্যাদেশ অনুমোদন করে নতুন পার্লামেন্টে আরটিআই আইন পাস হয়। সংসদে পাস হওয়া ওই আইন তখনই তার উদ্দেশ্য অর্জনে সফল হবে, যখন সরকার তা কার্যকর করার ব্যাপারে সব ধরনের পদক্ষেপ নেবে এবং ভারতের আদালতের মতো এ দেশের আদালতও তথ্য গোপনকারী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণে প্রস্তুত থাকবেন।
বর্তমান সরকারের প্রস্তাবিত ডিজিটাল বাংলাদেশ কর্মসূচি সরকারি কার্যক্রম ও নীতিমালা-সম্পর্কিত তথ্য সরবরাহের পরিমাণ বাড়াতে পারে। এ ছাড়া দেশে যেসব বিভিন্ন ই-গভর্নমেন্ট পদ্ধতির সূচনা হয়েছে, এ কার্যক্রম সেগুলোকে এগিয়ে নিতে সাহায্য করতে পারে। সরকার এ কার্যক্রম বাস্তবায়নে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হলে শাসনপদ্ধতির মান অনেক উন্নত হবে।
জবাবদিহিমূলক সরকার প্রতিষ্ঠা নিঃসন্দেহে একটি দীর্ঘমেয়াদি সময়ের ব্যাপার। এর জন্য গোটা পক্ষপাতিত্বমূলক রাজনীতির কৌশলযন্ত্রকে অকার্যকর করে দিতে হবে, যা বর্তমান রাজনৈতিক প্রক্রিয়াকে কলুষিত করছে; পেশাদারিকে খাটো করছে এবং দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দিচ্ছে। এটা করা একমাত্র তখনই সম্ভব হবে, যখন পেশাজীবী সমিতি, ব্যবসায়ী সংগঠন, স্বাধীন নীতি-গবেষণাকেন্দ্র, এনজিও, গণমাধ্যমসহ নাগরিক সমাজের সব সেক্টর সত্যিকারের স্বাধীন বিচারব্যবস্থা এবং একমাত্র মেধার ভিত্তিতে নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের দ্বারা পরিচালিত স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক সরকারি সংস্থার দাবি তুলবে। এটা যে রাতারাতি হয়ে যাবে এমন নয়; তবে নৈতিক আচরণবিধির সঙ্গে দৃঢ়সংলগ্ন থাকার প্রত্যয় যাদের মধ্যে আছে, তাদের প্রত্যেকে এ কাজ আজই শুরু করতে পারেন।
যত দিন পর্যন্ত পক্ষপাতের রাজনীতি সক্রিয় থাকবে এবং প্রধান দলগুলো মাস্তান ও গুন্ডাদের বরণ করবে, বাংলাদেশ তত দিন দুর্বল প্রশাসনের কারণে খোঁড়া হয়ে থাকবে। উদাহরণ হিসেবে সম্প্রতি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত একটা খবরের কথা বলি। ওই খবরে বলা হয়েছে, ‘গাড়ি রিকুইজিশনের বিষয়ে হতাশা প্রকাশ করে ব্যবসায়ী নেতারা বলেছেন, প্রয়োজনে পুলিশের জন্য আলাদাভাবে তাঁরা গাড়ির ব্যবস্থা করতে রাজি আছেন, তবু তাঁরা তাঁদের গাড়ি রিকুইজিশন করা দেখতে চান না। এ ছাড়া বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় বাণিজ্যিক পর্ষদ ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার্স অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এফবিসিসিআই) নেতারা পণ্য পরিবহনের সময় রাস্তায় চাঁদাবাজি ও ছিনতাইয়ের ব্যাপারে হতাশা প্রকাশ করেছেন এবং এসব বন্ধ করার জন্য বিশেষ সেল গঠনের জন্য সরকারকে প্রস্তাবও দিয়েছে।’ (ঢাকা, ১৭ সেপ্টেম্বর বিডিনিউজ২৪ডটকম)। আমি মনে করি, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের এখনো বহু পথ পাড়ি দিতে হবে।
একমাত্র জনগণ যেদিন সৎ, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক সরকারের দাবি তোলা শুরু করবে, সেদিনই বাংলাদেশের রাজনীতিতে পরিবর্তন আসা শুরু করবে। যাঁদের হাতে সম্পদ আছে, দেশের বর্তমান দুর্বল রাজনৈতিক চর্চাকে চ্যালেঞ্জ করার ক্ষেত্রে তাঁরা নেতৃত্ব দিতে এগিয়ে আসতে পারেন। এখন পর্যন্ত ব্যবসায়ী নেতারা রাজনীতিক শ্রেণীর সঙ্গে আপস করতে চাইছেন অথবা সরাসরি রাজনৈতিক দলে যোগ দিচ্ছেন। কিন্তু তা না করে এফবিসিসিআইয়ের নেতাদের এ সংগঠনকে স্বাধীন রাখার দাবি করা এবং ক্ষমতাসীনদের স্বেচ্ছাচারিতাকে প্রত্যাখ্যান করা উচিত। এ ছাড়া বন্দর, বিদ্যুৎ, আদালতসহ রাষ্ট্রের অন্য যেসব অকার্যকর অংশ বা খাত দেশের উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করছে, সেগুলোতে সংস্কার আনার আন্দোলনে তাঁদেরই নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য এগিয়ে আসা উচিত।
নিঃসন্দেহে ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদের একার পক্ষে এসব ক্ষেত্রে পরিবর্তন আনা সম্ভব হবে না। একুশ শতকের নতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাংলাদেশকে জেগে উঠতে হলে এবং দেশবাসীর জীবনমান পরিবর্তন করতে হলে সুশাসন প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে সমাজের সব শ্রেণীকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে।
অনুবাদ: সারফুদ্দিন আহমেদ








