চারদিকে নানা প্রতিবন্ধকতার বেড়াজাল। তবুও থেমে নেই জীবনের এগিয়ে চলা। মুঠো মুঠো জীবনের গল্প সঙ্গে নিয়ে প্রিয় মাতৃভূমি ছুটে চলেছে উন্নয়নের সড়কে। উন্নতির এই খেরোখাতায় নিঃশব্দে যারা অবদান রাখছেন, সেইসব বাধা পেরোনো প্রান্তিক মানুষের জীবনযুদ্ধ জয়ের গল্প নতুন বাংলাদেশের অংশ।
মীর গোলাম মোস্তফা
সুখের আশায় বাবা-মা অপরিণত বয়সে বিয়ে দিয়েছিলেন তাকে। কিন্তু বিয়ের অল্প ক'দিনের মাথায় স্বামীর সংসারে সুখের পরিবর্তে অশান্তি আর নির্যাতনের মধ্যে পড়েন ময়মনসিংহের রোজী আক্তার। প্রতিদিন তার অভাব আর নির্যাতনের নতুন নতুন গল্প তৈরি হতে থাকে। এর পরও রোজী খুবই ধৈর্য আর সহনশীলতার পরিচয় দিয়ে স্বামীর সংসারে মানিয়ে নিতে চেষ্টা করেন। এমন অবস্থায় প্রতিবেশীদের সহায়তায় রোজী আক্তার একটি বেসরকারি সংস্থার সচেতনতামূলক সভায় যোগ দেন। এখানে বিভিন্ন কর্মসূচির কথা শুনে কয়েকটি আয়বর্ধক প্রশিক্ষণে অংশ নেন। এর মধ্যে শপিং ব্যাগ তৈরির কাজ তার পছন্দ হয়। রোজী ৩২০ টাকার পুঁজি নিয়ে শপিং ব্যাগ তৈরির কাজে হাত দেন। এ ব্যবসায় তার সাফল্য আসে। বর্তমানে রোজী বাঁশের বেড়ার ঘর থেকে টিনশেড বিল্ডিংয়ে বসবাস করছেন। বাসায় এখন ফ্রিজ ও টেলিভিশন স্থান পেয়েছে। নিজের শপিং ব্যাগ সাপ্লাইয়ের জন্য রিকশা ভ্যানও কিনেছেন। এখন তার বিনিয়োগসহ নগদ টাকার পরিমাণ ৪ লাখ। তার আকাঙ্ক্ষা, ১০ লাখ টাকা সঞ্চয় করে একটি শপিং ব্যাগ তৈরির মেশিন কিনবেন। এ শপিং ব্যাগই তার স্বামীর ভালোবাসা এনে দিয়েছে, পরিবারে ফিরে এসেছে শান্তি।
সদর উপজেলার শহরতলি বারেরা গ্রামের আবদুল জলিলের মেয়ে রোজী আক্তারকে ১৯৯৮ সালে ১৪ বছর বয়সে শহরের গোহাইলকান্দি মীরবাড়ি এলাকার বিল্লাল হোসেনের সঙ্গে বিয়ে দেয় তার পরিবার। অর্থনৈতিক অসচ্ছলতার কারণে আবদুল জলিল তার ৫ম শ্রেণী পড়ূয়া রোজীকে বিয়ে দিতে বাধ্য হন। কিন্তু স্বল্প আয়ের বিল্লাল হোসেনের সঙ্গে রোজীর বিয়ের পর পারিবারিক অশান্তি ক্রমেই বাড়তে থাকে। এভাবে এক বছর চলার পর তাদের সংসারে পুত্রসন্তান এবং আরও কয়েক বছর পর এক কন্যাসন্তানের জন্ম হয়। দু'সন্তান জন্মের পর অর্থনৈতিক অসচ্ছলতা আরও তীব্র হয়, তাদের সংসারে ঝগড়া আর নির্যাতন ক্রমেই বাড়তে থাকে।
এ পরিস্থিতিতে রোজীর স্বামী অধিক উপার্জনের খোঁজে শহরের বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়াতেন এবং যখনই বাড়ি ফিরতেন তখনই পরিবারের অন্য সদস্যদের নানা কথায় রোজী স্বামী সোহাগের পরিবর্তে শারীরিক নির্যাতনের শিকার হতেন। এ অবস্থায় রোজী ২০০৪ সালে প্রতিবেশী এক মহিলার সঙ্গে বেসরকারি সংস্থা ইনস্টিটিউট ফর এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট [আইইডি] পরিচালিত এক সচেতনতা সভায় যোগ দেন। এখানে তিনি নারীর নেতৃত্ব বিকাশ, আইন সচেতনতা এবং দক্ষতা উন্নয়নমূলক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। এ ছাড়াও রোজী কয়েকটি আয়বর্ধক প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে অংশ নেন।
এসব প্রশিক্ষণের মধ্যে শপিং ব্যাগ তৈরির কর্মসূচি তার ভালো লাগে। এ ভালো লাগা থেকেই রোজী ২০০৭ সালে ৩২০ টাকা পুঁজি নিয়ে শপিং ব্যাগ তৈরির উদ্যোগ নেন। এ স্বল্প পুঁজি নিয়ে রোজী শহরের বড় বাজারে গিয়ে শপিং ব্যাগ তৈরির কাগজ, সুতা, আঠা ও বোর্ড জাতীয় মোটা কাগজ কেনেন। এসব উপকরণ দিয়ে শপিং ব্যাগ তৈরি এবং বাজারে বিক্রি শুরু করেন। এ ব্যবসার টাকা সংসারে খরচ করেও সঞ্চিত অর্থ জমা করতে থাকেন। ২০০৮ সালে জুলাই মাসে রোজী 'বাজার সম্প্রসারণ শিক্ষা' বিষয়ক প্রশিক্ষণে অংশ নিয়ে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে শপিং ব্যাগ তৈরির কাজ সম্প্রসারণ করতে শুরু করেন।
বর্তমানে রোজী আক্তার দারিদ্র্য কাটিয়ে সচ্ছল জীবন-যাপন করছেন। তার এই ব্যবসার সঙ্গে স্বামী বিল্লাল হোসেনও যোগ দিয়েছেন। শপিং ব্যাগ সাপল্গাইয়ের শহরকেন্দ্রিক অর্ডারের পাশাপাশি এখন উপজেলা পর্যায়ে সম্প্রসারিত হয়েছে। জেলা শহরের বাইরে তারাকান্দা, ভালুকা, ত্রিশাল, গফরগাঁও, ফুলবাড়িয়া, মুক্তাগাছা উপজেলা ও শহরতলি শম্ভুগঞ্জ এলাকায় শপিং ব্যাগের অর্ডার নেওয়া হচ্ছে। বর্তমানের রোজী আক্তারের এ ব্যবসায় ৭০ মহিলা কর্মী কাজ করছেন। প্রতিদিন এসব মহিলা সকালে শপিং ব্যাগ তৈরির উপকরণ নিয়ে যায় এবং বিকেলে সরবরাহ করে থাকেন। এসব মহিলা শপিং ব্যাগ তৈরি করে ৫০ থেকে ৬০ টাকা আয় করে থাকেন প্রতিদিন। মহিলা কর্মীর মধ্যে নাজমা বেগম, রাজিয়া ও নাসিমার সঙ্গে কথা হয়। তারা সবাই শপিং ব্যাগ তৈরি করে স্বামীর সংসারে সহায়তার পাশাপাশি জীবন বীমা করেছেন এবং মাসিক কিস্তি স্থানীয় এনজিওতে সঞ্চয় করছেন। মহিলা কর্মী রাজিয়া জানান, শপিং ব্যাগ তৈরির আয় থেকে প্রতি মাসে ৩০০ টাকা জীবন বীমায় জমা দেন। এ ছাড়াও সাপ্তাহিক হিসেবে স্থানীয় একটি এনজিওতেও অর্থ সঞ্চয় করছেন। আর স্বামীকে মাসে মাসে টাকা দিয়ে সহায়তা করেন বলে জানান।
রোজী আক্তার জানান, বর্তমানে স্বামী, দুই সন্তান ও পরিবারের সদস্যদের নিয়ে সুখেই আছেন। এখন তার ব্যবসায় বিনিয়োগ আছে ২ লাখ টাকা আর সঞ্চয় আছে ২ লাখ টাকা। প্রতিমাসে সকল খরচ বাদে নিট লাভ হয় ১৫ হাজার টাকা। এ ব্যবসায় ৭০ জন মহিলা কর্মী তার ব্যবসায় কাজ করে সচ্ছল জীবন-যাপন করছে। তার আকাঙ্ক্ষা, শপিং ব্যাগ তৈরির ব্যবসাকে আরও সম্প্রসারণ করে অভাবী মহিলাদের সচ্ছল জীবন-যাপনে সহায়তা করা। এজন্য তিনি ১০ লাখ সঞ্চয় করে একটি শপিং ব্যাগ তৈরি মেশিন কিনবেন।
অভাবকে জয় করে রোজী আক্তার স্বামীর ২ শতাংশ জমিতে বাঁশের বেড়ার ঘর থেকে টিনশেড বিল্ডিং তৈরি করেছেন। ইতিমধ্যে তিনি ফ্রিজ ও টেলিভিশন নিয়েছেন। ব্যবসার কাজে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট করেছেন এবং মোবাইল সংযোগ নিয়েছেন। এ মোবাইল ফোনের মাধ্যমে রোজী আক্তার বিভিন্ন উপজেলা থেকে শপিং ব্যাগ তৈরির অর্ডার নিয়ে থাকেন। তিন কক্ষ বিশিষ্ট টিনশেড বাসা ছাড়াও রোজী আক্তার বাসার পাশে ২ লাখ টাকা দিয়ে একটি মুদির দোকান কিনেছেন। এখানে শপিং ব্যাগ সংরক্ষণ ও তৈরির কাজ করা হয়।
রোজী তার জীবনের তিক্ত অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন, পারিবারিক জীবনে ধৈর্য ও শ্রম দিয়ে সংসারে সুখ-শান্তি আনা সম্ভব। নারীকে শুধু পুরুষের ওপর নির্ভরশীল না হয়ে উপার্জনের পথ খুঁজে বের করতে হবে। তবেই পরিবারে মর্যাদা পাওয়া যাবে। রোজী বলেন, কিছুদিন আগেও তার আশপাশের মহিলারা ঝগড়া করে সময় কাটাত। এখন কাজ করে ঝগড়ার সময় পায় না। সবাই পারিবারিক জীবনে আগের চেয়ে সুখ স্বাচ্ছন্দ্যে বসবাস করছে।
এদিকে আন্তর্জাতিক নারী দিবসের শতবর্ষ উদযাপন উপলক্ষে ময়মনসিংহ জেলা নারী নির্যাতন প্রতিরোধ কমিটি ২০১০ সালের ১৩ মার্চ ময়মনসিংহ টাউন হল শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে এক আলোচনা সভা, সম্মাননা প্রদান ও পুরস্কার বিতরণী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এ সম্মাননা প্রদান অনুষ্ঠানে চারজন নারীকে সমাজে তাদের অবদানের জন্য সম্মাননা দেয়া হয়। ওই সম্মাননা প্রদান অনুষ্ঠানে রোজী আক্তারকে তৃণমূলের নারী হয়েও পারিবারিক, সামাজিক বাধা-বিপত্তি অতিক্রম করে স্বাবলম্বী হওয়া এবং নির্যাতিত নারীদের কর্মসংস্থানে এবং অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা আনয়নে উদ্যোগী ভূমিকা পালনের জন্য সম্মাননা দেওয়া হয়।








