বাংলাদেশপ্রেমী জাপানি দম্পতি: হিরোকি ওয়াতানাবে ও ম্যায়েওয়াতানাবে
ছবি: সৈকত ভদ্র
বস্তি আর পথশিশুদের নিয়ে হাজারও প্রশ্ন জেগেছিল এক জাপানি তরুণের মনে। সেই উত্তর খুঁজতেই তরুণ হিরোকি পা রাখলেন বাংলাদেশে। বাংলাদেশের এক ঝাঁক তরুণকে নিয়ে তৈরি করলেন ‘একমাত্রা’ নামের সংগঠন। সঙ্গে এসে যোগ দিলেন জাপানি কন্যা ম্যায়ে। তারপর?
তানজিনা হোসেন |আজ থেকে ১০ বছর আগের কথা। শৌখিন জাপানি ইয়ট চালক হিরোকি ওয়াতানাবে ইয়ট চালনা প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে গিয়েছিলেন থাইল্যান্ডে। বিলাস আর জাঁকজমকের কমতি ছিল না পুরো আয়োজনে। মোটামুটি চোখ ধাঁধিয়ে যাচ্ছিল হিরোকির। আনন্দে-চাকচিক্যে বিলাস-ব্যসনে গা ভাসিয়ে দিনগুলো কাটছিল ভালোই। এরই মধ্যে একদিন তাঁদের নিয়ে যাওয়া হলো শহরের বাইরে এক পর্যটনকেন্দ্রে। সেই পর্যটনকেন্দ্র দর্শনই হিরোকির জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেবে কে জানত!
সেবারই হিরোকির জীবনে প্রথম বস্তি-দর্শন ঘটে। হিরোকি দেখেছিলেন মাইলের পর মাইল ঝুপড়ি, অসহায়, চরম অন্যায্য জীবনযাপনের নিদর্শন। ঝাঁ-চকচকে থাইল্যান্ডের অন্য এই রূপ দেখে সত্যিকার অর্থেই চমকে গেলেন হিরোকি। একদিন জানালা দিয়ে উঁকি দিলেন আর দেখতে পেলেন শতচ্ছিন্ন ময়লা কাপড় পরা এক সুবিধাবঞ্চিত শিশু দাঁড়িয়ে আছে রাস্তার পাশে। পলকের জন্য ছেলেটার সঙ্গে চোখাচোখি হলো হিরোকির। কী যেন ঘটে গেল তাঁর মধ্যে। এই যে তিনি, হিরোকি ওয়াতানাবে, জন্মসূত্রে জাপানি নাগরিক, লেখাপড়া আর শখের ইয়ট চালনা নিয়ে আছেন আনন্দে আর সুখে। অথচ এই ছেলেটা জীবনের প্রায় সব সুবিধা থেকেই বঞ্চিত। কারণ সে জন্মেছে বস্তিতে।
হিরোকির কথা শুনে সিদ্ধার্থর কথা মনে পড়ে। রাজকুমার সিদ্ধার্থ পথের মধ্যে দেখতে পেয়েছিলেন জরা আর মৃত্যুর ভয়ংকর দৃশ্য। সেই দৃশ্য তাঁকে এমন তাড়া করে ফিরছিল যে নিজের রাজত্ব, বৈভব, পরিবার আর নিশ্চিত জীবন ছেড়ে তিনি পথে নেমেছিলেন এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে। আমাদের হিরোকিও রাজকুমার সিদ্ধার্থের মতো একদিন পথে নামলেন। ছাড়লেন ঘর-দেশ-পরিবার। ২০০২ সালের ডিসেম্বর মাসে প্রথম বাংলাদেশে পা রাখেন হিরোকি। কিন্তু এত দেশ থাকতে বাংলাদেশেই কেন?
হিরোকির জবাব, ‘আমি আসলেই জানি না কেন। বাংলাদেশের কথা প্রথম পড়েছি স্কুলের পাঠ্যবইয়ে, প্রাকৃতিক দুর্যোগে কবলিত দেশ হিসেবেই চেনানো হয়েছিল দেশটাকে। কেন যে সবকিছু ছাপিয়ে স্মৃতিতে সেই দেশটির কথাই ভেসে উঠল আর ঠিক এখানেই আসতে ইচ্ছে হলো তা এখনো রহস্য।’
কিন্তু সত্য এই যে বাংলাদেশই ছিল হিরোকির গন্তব্য। হিরোকির বাংলাদেশে পা রাখার পরের ১০ বছরে ঘটবে এমন অনেক কিছু, যা অনেক বানানো গল্প আর কেচ্ছা-কাহিনিকেও হার মানায়। পাঠক, আমাদের হিরোকির জীবনের গল্প তাই তাঁর বাংলাদেশে পা রাখার পর মুহূর্ত থেকে শুরু।
আনন্দ নিবাস
হিরোকি জানতেন তিনি বাইরে থেকে আসা এক উটকো বিদেশি। এই দেশের জন্য কিছু করতে হলে তাঁকে আগে এ দেশেরই একজন হয়ে উঠতে হবে। তাই দু-চার মাস এদিক-ওদিক ঘোরাঘুরি করে তিনি ভর্তি হলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটে। উদ্দেশ্য ভাষা শিক্ষা। অচিরেই একদল স্বপ্নবান তরুণ তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু হয়ে উঠল: শুভ, নিলয়, মেহেদী, নীতু, তৌহিদ এবং আরও অনেকে। ওঁরা সবাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রী। প্রতিদিন তর্ক, আড্ডা, গান, ছবি নিয়ে মেতে থাকতেন তাঁরা। সবাই মিলেমিশে টিএসসি, অপরাজেয় বাংলা কি কলাভবনে নিত্য হই হই চলতে লাগল। এই বন্ধুদের মধ্যে কেউ ভালো গান করেন, কেউ গান লেখেন, কেউ সিনেমা বানান, কেউ ছবি আঁকেন। আর প্রত্যেকেই স্বপ্ন দেখেন। সমাজের বৈষম্য আর অন্যায় তাঁদের পোড়ায়। সমাজ পাল্টানোর ইচ্ছেও আছে তাঁদের, কিন্তু উপায় জানা নেই। এসব নিয়ে অনেক তর্ক-বিতর্কের মধ্যেই গড়ে ওঠে ‘একমাত্রা’। ওপর-নিচ, ধনী-গরিব সবাইকে একটা মাত্রা থেকে দেখার ও নিয়ে আসার স্বপ্ন এই সংগঠনের। ওসমানী উদ্যান, হাইকোর্টের মাজার, স্টেডিয়াম ইত্যাদি জায়গায় ভবঘুরের মতো ঘুরে বেড়ানো পথশিশুদের নিয়ে শুরু হলো তাঁদের খোলা আকাশের নিচে স্কুল। এই স্কুলে কেবল বিদ্যাশিক্ষাই নয়, পথশিশুদের শেখানো হয় গান, নাটক, ছবি আঁকা ও আরও নানা সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড। কেননা কেবল অক্ষরজ্ঞানই বড় কথা নয়, তার চেয়ে জরুরি হলো জীবনের প্রতি এক ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি আর আত্মবিশ্বাস গড়ে ওঠা। যে আত্মবিশ্বাস মানুষকে নিজের চেয়ে উঁচু এক অবস্থানে নিয়ে যেতে সাহায্য করে। মানুষের মধ্যে মানবিক গুণাবলিকে জাগ্রত করে। প্রথম দিকে ঝরে পড়ল অনেকে। বিশৃঙ্খল জীবনযাপন আর অন্ধকার জগতের হাতছানি এড়াতে পারেনি অনেকেই। কিন্তু যারা পারল, দ্বিতীয় পরিকল্পনা শুরু হলো তাদের নিয়েই। টিকে থাকা শিশুদের নিয়ে মিরপুর ১ নম্বর এলাকায় শুরু হলো একমাত্রার শেল্টার হোম আনন্দ। এখানে একজন পথশিশুর থাকা-খাওয়া থেকে শুরু করে লেখাপড়া, গানবাজনা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড সবকিছুর দায়িত্ব নিলেন একমাত্রার কর্মীরা।
জাপানি কন্যা ম্যায়ে
এখানে আমাদের গল্পে নায়িকার আবির্ভাব ঘটবে। তাঁর নাম ম্যায়ে ওয়াতানাবে। ম্যায়ে এক অপরূপা জাপানি মডেল, সংস্কৃতিকর্মী ও মঞ্চ-অভিনেত্রী। টোকিওর সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে সুপরিচিত এক নাম। বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে সাংস্কৃতিক বিনিময়ের এক কার্যক্রমে অংশ নিতে ২০০৯ সালে বাংলাদেশে আসেন ম্যায়ে। হিরোকি ও একমাত্রার সঙ্গে তখনই প্রথম পরিচয়। একমাত্রার কার্যক্রম সরেজমিনে দেখে রীতিমতো মুগ্ধ ও আলোড়িত হন ম্যায়ে। দেশে ফিরে গিয়েও এঁদের ভুলতে না পেরে নানাভাবে যোগাযোগ রাখতে শুরু করেন। একমাত্রার শিশুদের নিয়ে জাপানের বিভিন্ন শহরে সফল অনুষ্ঠান করার পেছনে তাঁর যোগাযোগ বিশেষ অবদান রেখেছিল, এ কথা স্বীকার করেন হিরোকি। আর ম্যায়ে সেই অনুষ্ঠানগুলো সম্পর্কে বলতে গিয়ে উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠলেন, ‘স্টেজে এই শিশুদের পারফরম্যান্স অসাধারণ হয়। তাদের কোনো ভয় নেই, বিচলিত ভাব নেই, কুণ্ঠা নেই। আশ্চর্য রকমের স্বতঃস্ফূর্ত ওরা। যেকোনো জায়গায় যেকোনো পরিবেশে দুর্দান্ত শো করতে পারে। একেবারে মঞ্চ ফাটিয়ে ফেলে।’ এভাবে একমাত্রা, হিরোকি, বাংলাদেশ—সবকিছুর সঙ্গে ম্যায়ের ভালোবাসাবাসির শুরু। অবশেষে দুই বছর পর ম্যায়ে সিদ্ধান্ত নিলেন পাকাপাকিভাবে বাংলাদেশে চলে আসার। সে কি কেবল হিরোকির টানে? সলজ্জ হাসি হাসেন নতুন বাংলা শিখতে শুরু করা ম্যায়ে, ‘এখানে, এই শিশুদের নিয়ে.. খুবই আনন্দ!’ এই পবিত্র আর অপার্থিব আনন্দে ঝলমল করেন ম্যায়ে, যে আনন্দের সন্ধান পেতে নিজের দেশ, পরিবার ও নিজের বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ার ছেড়েছেন তিনি। একমাত্রার শিশুদের নাচের মুদ্রা শেখানো, নাটকের মহড়া আর সাজসজ্জার কাজ নিয়ে দারুণভাবে মেতে আছেন এখন। সম্প্রতি মেরিল-প্রথম আলো পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানের একটি অংশে অভিনয়ও করেছেন ম্যায়ে। এ বছরই ধানমন্ডির রবীন্দ্রসরোবরে এক দারুণ অনুষ্ঠান আর বন্ধুদের হইহল্লার মধ্য দিয়ে গাঁটছড়া বেঁধেছেন ম্যায়ে ও হিরোকি। পুরোপুরি বাংলাদেশি রীতিনীতিতে বিয়ে হয়েছে তাঁদের। ম্যায়ের জন্য শাড়ি কেনা থেকে শুরু করে ফুলের মঞ্চ সাজানো পর্যন্ত সব কাজ দারুণ হইচই আর উত্সাহ নিয়ে সেরেছেন বন্ধুরা। প্রিয় হিরোকি ও ম্যায়ের বিয়েতে অসাধারণ এক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিল একমাত্রার শিশুরা। নাচ, গান আর আনন্দে ভরপুর বিয়ের অনুষ্ঠানে তাঁদের মনেই হয়নি যে এখানে তাঁদের কোনো স্বজন ছিল না।
এই বেশ ভালো আছি
বিয়ের পর ঢাকার মিরপুরে নতুন সংসার পেতেছে এই জাপানি দম্পতি। এক গাদা বন্ধুবান্ধব আর একমাত্রার শিশু-কিশোরেরাই এখানে তাদের আত্মার আত্মীয়, স্বজনের চেয়েও বড় স্বজন। এই স্বজনবেষ্টিত হয়ে সুখে আর আনন্দেই আছেন তাঁরা, যে আনন্দের সন্ধান পেতে একদিন তাঁরা ঘর ছেড়েছিলেন। জ্যৈষ্ঠ মাসের অসহনীয় লোডশেডিংয়ে একমাত্রার ছোট্ট অফিসে আইপিএস অচল হয়ে যাওয়ার পরও তাই হিরোকি ও ম্যায়ে ওয়াতানাবে নামের এই আশ্চর্য দুই তরুণ-তরুণীর মুখের হাসি বিন্দুমাত্র মলিন হয় না। এই চোরাবালির শহরে অজস্র ও বিচিত্র মানুষের স্রোতে মিশে গেছেন আমাদের গল্পের পাত্র-পাত্রী। এখান থেকে হয়তো তাঁদের দ্বিতীয় গল্পের শুরু। সেই গল্প অন্য কোনোখানে, কি অন্য কোনো সময়ে করা যাবে। এখন আমরা ম্যায়ের সুললিত কণ্ঠে বাংলা গান শুনি, ‘আমার গরুর গাড়িতে বউ সাজিয়ে....যাব তোমায় শ্বশুরবাড়ি নিয়ে..।’ গাইতে গিয়ে কাচ ভাঙা হাসিতে গড়িয়ে পড়েন নববধূ।
হিরোকি বলেন, ‘কয় শ বা কয় হাজার শিশুকে অক্ষরজ্ঞান দেওয়া হলো সেই সাফল্যের স্বপ্নে আমরা বিভোর নই। আমরা চাই যে কয়েকজনই হোক এরা যেন প্রকৃত অর্থে একেকজন আত্মবিশ্বাসী, দেশপ্রেমিক, মানবিক গুণাবলিসম্পন্ন মানুষ হয়ে ওঠে। পাঁচ-দশ বা ২০ জন করে হলেও চলবে, কিন্তু আমরা ওদের শেষ পর্যন্ত নিয়ে যেতে চাই।’ আর তাই এবার একমাত্রার পরিকল্পনার তৃতীয় ধাপ শুরু হতে যাচ্ছে। ডাচ—বাংলা ব্যাংকের সহায়তায় ময়মনসিংহের হালুয়াঘাটে সাড়ে তিন একর জমির ওপর গড়ে উঠছে একমাত্রা একাডেমি বা প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। চলচ্চিত্র নির্মাণ, মিডিয়া টেকনিক, ইংরেজি ভাষা, ক্রিয়েটিভ ডিজাইন, নাটক, হসপিটালিটি ইত্যাদি বিষয়ের ওপর প্রশিক্ষণ ও উচ্চশিক্ষার ব্যবস্থা থাকবে এতে। আনন্দের পাস করা ছেলেমেয়েরা এর পরের ধাপে চলে যাবে সেখানে। একাডেমিতে তারা এমন কিছু শিখবে যাতে কেবল কর্মসংস্থান নয়, সমাজ বদলে দেওয়ার অঙ্গীকারে অবদান রাখতে পারবে তারাও।









