নারীদের মামলার তদন্ত এখন নারীরাই করছেন প্রতি মাসেই ২০-২২ মামলার চার্জশিট
লেখক: সমীর কুমার দে
সুন্দরী কিশোরী সুবর্ণা (ছদ্মনাম)। স্কুলে যাওয়ার পথে বখাটের হাতে শ্লীলতাহানির পর সিদ্ধান্ত নিয়েছিল আত্মহত্যার। বিষ পাণ করে সেই পথেই এগিয়েছিল সে। কিন্তু পরিবারের সদস্যদের দ্রুত তত্পরতায় সৌভাগ্যক্রমে বেঁচে গেল। আশ্রয় মেলে তার পুলিশের উইমেন সাপোর্ট অ্যান্ড ইনভেস্টিগেশন ইউনিটে। এখানকার নারী পুলিশ সদস্যরা ওই বখাটে দলকে গ্রেফতার করেছে। তাদের বিরুদ্ধে চার্জশিট দিয়েছে আদালতে। পাশাপাশি নিপীড়িত কিশোরীটির পাশে দাঁড়িয়ে ঘুরিয়ে দিয়েছে তার জীবনের দৃষ্টিভঙ্গি। এভাবে নির্যাতিত নারীদের পাশে দাঁড়াচ্ছে পুলিশের এই ইউনিটটি। রাজধানীর বিভিন্ন থানায় নারীদের দায়ের করা মামলা বা নারীরা আসামি হলে তার তদন্ত এখন করছে শুধু নারীদের নিয়ে গঠিত পুলিশের এই ইউনিট।
রাজধানীর এক অভিজাত ফ্ল্যাটের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে নিজেকে বন্দী করে রেখেছিলেন সুন্দরী গৃহবধূ আজমেরী জেসি সুপ্তি। অতীতের কষ্ট থেকে সিজোফ্রেনিয়া রোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন। ধীরে ধীরে সমাজ, পরিবার ও স্বামী হারিয়ে উন্মাদের মতো আচরণ করতে থাকেন তিনি। একইসঙ্গে একমাত্র ফুটফুটে পুত্রসন্তানের ভাগ্যও যখন অন্ধকারে হারিয়ে যেতে বসেছিল, ঠিক তখনই সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয় পুলিশের উইমেন সাপোর্ট অ্যান্ড ইনভেস্টিগেশন ইউনিট। সেগুনবাগিচার অন্ধকার প্রকোষ্ঠ থেকে নারী পুলিশ কর্মকর্তারা তাকে উদ্ধার করে চিকিত্সাসেবা দেন। নিয়োগ করেন মনোবিজ্ঞানী। আইনগত সহায়তার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা করেন তার অধিকার। একপর্যায়ে জেসি সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসেন। ফিরে পান তার পরিবার ও স্বামীকে। বর্তমানে পুত্র ও স্বামীকে নিয়ে তিনি আবার সাজিয়েছেন সংসার।
উইমেন সাপোর্ট অ্যান্ড ইনভেস্টিগেশন ইউনিটের সহকারী কমিশনার (এসি) মিনা মাহমুদ বলেন, ‘দুস্থ, অসহায় ও নির্যাতিত নারীদের অধিকার প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি তাদের শারীরিক ও মানসিকভাবে সুস্থ করার জন্য বিভিন্ন সংগঠনের সহায়তা নেয়া হয়। এ ক্ষেত্রে ভিকটিমের শারীরিক ও মানসিক অবস্থা বুঝে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। ফলে খুব কম সময়ের মধ্যেই নির্যাতিত নারী মানসিকভাবে আত্মপ্রত্যয়ী হয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসেন।’
উইমেন সাপোর্ট অ্যান্ড ইনভেস্টিগেশন ইউনিটের একজন কর্মকর্তা বলেন, অনেক ক্ষেত্রেই পুরুষ পুলিশের তুলনায় মহিলা পুলিশ কর্মকর্তাদের পেশাগত দায়িত্ববোধ বেশি। বিশেষ করে নির্যাতিত নারীদের অধিকার আদায়ে বিষ্ময়কর সাফল্য দেখিয়েছেন তারা। তারা জানান, উইমেন সাপোর্ট অ্যান্ড ইনভেস্টিগেশন ইউনিট গত এপ্রিলে ২০টি এবং মে মাসে ৩২টি মামলার তদন্তের কাজ সম্পন্ন করে আদালতে চার্জশিট দিয়েছে। গত বছরের জুলাই থেকে এই ইউনিটটি কাজ শুরু করার পর প্রতি মাসেই গড়ে প্রায় ২০-২২টি মামলার নিষ্পত্তি করছে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের উইমেন সাপোর্ট এন্ড ইনভেস্টিগেশন ইউনিট মামলার তদন্ত করার পাশাপাশি অসহায়, নিপীড়িত ও আশ্রয়হীন নারীদের পাশে দাঁড়াচ্ছে। আর দুষ্কৃতিকারীদের হাতে নিগৃত নারীদের বিচারের সুযোগও করে দিচ্ছে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের উপপুলিশ কমিশনার মো. মাসুদুর রহমান ইত্তেফাককে বলেন, নারী পুলিশের ব্যতিক্রমী ও সেবামূলক প্রতিষ্ঠান হিসেবে উইমেন সাপোর্ট অ্যান্ড ইনভেস্টিগেশন ইউনিট কাজ করছে। এখানে দায়িত্বপালন করা পুলিশ সদস্যরা অত্যন্ত দক্ষ ও দ্রুততার সঙ্গে বিভিন্ন নারী নির্যাতনের অভিযোগ এবং মামলার নিষ্পত্তি করছেন। নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই তারা থানার পুলিশের পাশাপাশি নারী নির্যাতন মামলার তদন্ত কাজ সম্পন্ন করে আদালতে চার্জশিট দাখিলও করছেন।
সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ঢাকা মহানগরীর ৪৮টি থানায় প্রতিদিন গড়ে ১১০ থেকে ১২০টির মতো মামলা হয়। এর মধ্যে ১৫ থেকে ২০টি মামলা হয় নারী নির্যাতন-সংক্রান্ত। এসব মামলার গুরুত্ব বিবেচনা করে তদন্তভার উইমেন সাপোর্ট অ্যান্ড ইনভেস্টিগেশন ইউনিটে হস্তান্তর করেন সংশ্লিষ্ট ডিভিশনের উপপুলিশ কমিশনার। সূত্র মতে, বর্তমানে উইমেন সাপোর্ট অ্যান্ড ইনভেস্টিগেশন ইউনিটে ৬৮ জন নারী পুলিশ কর্মকর্তা ও সদস্য থাকার কথা। কিন্তু বর্তমানে আছেন ৬০ জনের মতো। একজন উপপুলিশ কমিশনারের (ডিসি) অধীন একজন অতিরিক্ত উপপুলিশ কমিশনার (এডিসি), ৪ জন সহকারী পুলিশ কমিশনার (এসি), একজন ইন্সপেক্টর, ১২ জন সাব-ইন্সপেক্টর, ১৪ জন এসিস্ট্যান্ট সাব-ইন্সপেক্টর ও ২২ জন মহিলা পুলিশ কনস্টেবল ওই প্রতিষ্ঠানে নিয়োজিত আছেন। তবু থানার পুলিশের তুলনায় নারীদের তদন্ত কাজ দ্রুততার সঙ্গে সম্পন্ন হচ্ছে।








