সংশোধন শেষে প্রকাশের অপেক্ষায় হুমায়ূনের 'দেয়াল'

সদ্য প্রয়াত নন্দিত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের সর্বশেষ উপন্যাস দেয়াল প্রকাশিত হবে আগামী বইমেলায়। আদালতের নির্দেশনা মোতাবেক, হুমায়ূন আহমেদ মৃত্যুর আগে দেয়ালের স্পর্শকাতর বিষয়গুলো সংশোধন করে দিয়ে গেছেন বলে পারিবারিক সূত্রে দাবি করা হয়েছে। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যা ও তার পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে লেখা এই উপন্যাসটির দুইটি অধ্যায় একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত হলে তাতে বেশ কিছু তথ্য বিকৃতি আদালতের চোখে পড়ে। এরই প্রেক্ষিতে গত ১৫ মে দেয়াল প্রকাশের ব্যাপারে কিছু পর্যবেক্ষণ দেয় আদালত। এ প্রসঙ্গে বইটির প্রকাশনা সংস্থা অন্যপ্রকাশের প্রধান নির্বাহী মাজহারুল ইসলাম যায়যায়দিনকে বলেন, আদালত দেয়ালের পান্ডুলিপি পড়ে এর বেশ কিছু বিষয়ে আপত্তি তোলেন। এরই প্রেক্ষিতে হুমায়ূন স্যার তা সংশোধন করেছেন। বর্তমানে এ অবস্থাতেই রয়েছে দেয়াল। তার মৃত্যুর পর তারা এখনো পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়ে উঠতে পারেনি। কিছুদিন পর এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন। কবে নাগাদ দেয়াল প্রকাশিত হতে পারে_ এ প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী বইমেলাতে দেয়াল প্রকাশিত হবে। গত ২৫ মে নুহাশপল্লীতে যায়যায়দিনকে দেয়া বিশেষ সাক্ষাৎকারে হুমায়ূন আহমেদ 'দেয়াল' নিয়ে বলেছিলেন, 'আমি একজন সাধারণ লেখক মাত্র। কোনো ইতিহাসবিদ নই। সেজন্য ইতিহাসভিত্তিক কোনো উপন্যাসে আমার লেখা তথ্যের ভুল থাকতেই পারে। তবে তার যাচাই বাছাই করার দায়িত্ব শুধুমাত্রই পাঠকের। যদি পাঠক মনে করে আমি সঠিক লিখেছি, তাহলে আমি ঠিক। পাঠক যদি মনে করে আমি ভুলে লেখেছি, তাহলে আমি ভুল।' তিনি আরো বলেছিলেন, 'এ বইটি নিয়ে আমি বেশি কিছু বলতে পারব না। আর বললেও তুমি (প্রতিবেদক) বা তোমার পত্রিকা ছাপাতে পারবে না। কারণ, এতে আদালতের নিষেধাজ্ঞা আছে। তবে, বইটি আমি এখনো লেখা শেষ করিনি। আমি প্রচুর বই পড়ছি এ বিষয়ের ওপর। আমি চেষ্টা করব সর্বোচ্চ নির্ভুল তথ্য সংবলিত বই পাঠকের হাতে তুলে দেয়ার।' হুমায়ূন আহমেদের পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, দেয়াল উপন্যাসটি ২০১২ সালের বইমেলাতে প্রকাশিত হওয়ার কথা ছিল। ক্যান্সারে আক্রান্ত অবস্থায় নিউইয়র্কে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি উপন্যাসটি লেখেন। কিন্তু শেষ মুহূর্তে বইটি বইমেলায় প্রকাশ করা সম্ভব হয়নি। জানা গেছে, 'দেয়াল' হুমায়ূন আহমেদের শেষ উপন্যাস। এর গ্রন্থস্বত্ব তার দ্বিতীয় স্ত্রী মেহের আফরোজ শাওনের নামে। বইটির ইন্টারন্যাশনাল বুক স্ট্যান্ডার্ড নাম্বার বা আইএসবিএন নাম্বার হচ্ছে '৯৭৮৯৮৪৫০২০৫৯৬'। এছাড়াও তিনি পবিত্র কোরআন শরীফ অবলম্বনে মহানবী হযরত মোহাম্মদ (সা.)-এর জীবনী লিখতে শুরু করেছিলেন। কিন্তু শেষ করতে পারেননি। এ বিষয়ে মেহের আফরোজ শাওনের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি গণমাধ্যমের সাথে কথা বলতে রাজি হননি। হুমায়ূন আহমেদের ছোট ভাই কার্টুনিস্ট আহসান হাবীব যায়যায়দিনকে জানান, তিনি ইতোমধ্যে সংশোধনী এনে দেয়াল উপন্যাসটি সম্পূর্ণ করে গেছেন। এমনকি পা-ুলিপির একটি কপি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও কর্নেল তাহের ভাই ড. আনোয়ার হোসেনকেও পাঠিয়েছেন। এ প্রসঙ্গে অধ্যাপক ড. আনোয়ার হোসেন যায়যায়দিনকে বলেন, 'হাইকোর্টের নির্দেশনার পর হুমায়ূন আহমেদ আমাকে সংশোধিত পা-ুলিপি দিয়েছিলেন। আমি তা পড়েছি। কিছু জায়গা আমার কাছে খটকা লেগেছিল, তা আমি আবার সংশোধন করে দিয়েছি।' প্রকাশের দিনক্ষণের বিষয়ে তিনি কিছু জানাতে পারেননি। জানা গেছে, দেয়ালের পা-ুলিপির আরেকটি কপি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের কাছেও তিনি দেন। দেয়ালের যে দুই অধ্যায় প্রকাশিত হয়েছিল, তার ভূমিকাও লিখেছিলেন তিনি। এ প্রসঙ্গে সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম বলেন, 'দেয়ালের খসড়া কপি হুমায়ূন আহমেদ আমাকে পড়তে দিয়েছিলেন। আমার কাছে বইটি পড়ে মনে হয়নি খলনায়কদের মহান করে দেখানো হয়েছে। বরং সমগ্র বইটি পড়লে বঙ্গবন্ধুর জন্য এক ধরনের আন্তরিক শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা জন্মায় আমাদের মনে।' তিনি বলেন, 'বইটিতে তথ্যগত ছোটখাটো কিছু ভুল আছে, যা আমি তাকে জানিয়েও ছিলাম। এই ভুল-ত্রুটিগুলো ঠিক করে নিলে ইতিহাস আশ্রিত উপন্যাস হিসেবে দেয়াল একটি সুখপাঠ্য বই হবে বলে আশা করি।' কেন আদালতের নিষেধাজ্ঞা গত বছরের ১১ মে, যেদিন হুমায়ূন আহমেদ বিশ দিনের জন্য বাংলাদেশে আসেন, সেদিনই একটি জাতীয় দৈনিকের সাহিত্য সাময়িকীতে দেয়ালের সাত ও আট অধ্যায় প্রকাশিত হয়। এ বিষয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম ১৪ মে বঙ্গবন্ধু হত্যা নিয়ে তথ্য বিকৃতির অভিযোগ তোলেন। তিনি বিষয়টি আদালতের নজরে আনলে বিচারপতি এ এইচ এম শামসুদ্দীন চৌধুরী ও বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন সেলিমের ডিভিশন বেঞ্চ ১৫ মে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে সংশোধনের আগে দেয়াল প্রকাশে নিষেধাজ্ঞা প্রদান করেন। আদালতে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেছিলেন, 'হুমায়ূন আহমেদের ওই উপন্যাসে বঙ্গবন্ধু হত্যাকা-ের বিবরণ যথাযথভাবে প্রকাশ পায়নি। এক জায়গায় তিনি লিখেছেন_বঙ্গবন্ধুর দুই পুত্রবধূ তাদের মাঝখানে রাসেলকে নিয়ে বিছানায় জড়াজড়ি করে শুয়ে থরথর করে কাঁপছিলেন। ঘাতক বাহিনী দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকল। ছোট্ট রাসেল দৌড়ে আশ্রয় নিল আলনার পেছনে। সেখান থেকে শিশু করুণ গলায় বললো, তোমরা আমাকে গুলি করো না। শিশুটিকে তার লুকানো জায়গা থেকে ধরে এনে গুলিতে ঝাঁঝরা করে দেয়া হলো'। অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, 'বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলায় ঘটনার একটি স্বীকৃত বিবরণ রয়েছে। তাতে দেখা যায়, বঙ্গবন্ধুর বাড়ির কাজের ছেলে রমার কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়ে গিয়ে রাসেলকে হত্যা করা হয়। কিন্তু দেয়ালে তা উল্লেখ করা হয়নি।' এছাড়াও বঙ্গবন্ধু স্বীকৃত খুনি কর্নেল ফারুককে বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে দেখানো হয়েছে। একই সাথে তার চরিত্রকে নায়কোচিত করা হয়েছে। মূলত এসব কারণেই দেয়াল সংশোধন করার আদেশ দেন আদালত। রেফারেন্স হিসেবে ছিল ভুল বই দেয়ালের তথ্য ভুল থাকার পেছনে রেফারেন্স বইয়ের হাত ছিল বলে তখন তার পরিবারের সদস্যরা জানান। তারা জানান, হালিমদাদ খানের 'বাংলাদেশের রাজনীতি ১৯৭২-১৯৭৫' বই থেকে তথ্য নিয়ে হুমায়ূন আহমেদ দেয়াল লেখেন। হালিমদাদ খানের বইটির বিষয়ে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এটি আগামী প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত হয়েছে। ১৩৩ পৃষ্ঠার এই বইটির মূল্য ২৫৫ টাকা। একই সাথে হুমায়ূন আহমেদ বিদেশি সাংবাদিক অ্যান্থনি মাসকারেনহাসের 'লিগ্যাসি অব বস্নাড' বইটিও পাঠ করেন। এই দুই বইয়ে বঙ্গবন্ধুর হত্যার বিবরন অনুযায়ী তিনি উপন্যাসটি রচনা করেন। পরে আদালত হুমায়ূন আহমেদকে বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার পেপারবুকটি পাঠান। তিনি সেই পেপারবুক অবলম্বনে দেয়াল সংশোধন করেন। এ সংশোধিত কপিটিই এখন প্রকাশের অপেক্ষায় রয়েছে।

দীপন নন্দী

Share/Save/Bookmark

abohoman

solid

আর্কাইভ

যোগাযোগ

পাঠক সংখ্যা

169871
TodayToday561
This weekThis week4720
This monthThis month20605
Guests 4