মিলি বিশ্বাস
প্রশাসনিক বিন্যাসে পুলিশ হচ্ছে সরকারের 'প্রসারিত হাত'। পুলিশের কর্ম পরিচালনা জনগণের দৃষ্টির ওপর স্বচ্ছ জলের মধ্যে সন্তরণের মতো। সরকারের এই অঙ্গটি খুবই সংবেদনশীল। জনগণের শান্তি, নিরাপত্তা, মানবাধিকার, শৃঙ্খলা রক্ষায় সরকারের প্রকৃত রূপ প্রতিফলিত হয় পুলিশের প্রতিদিনের কর্ম ও আচরণের মধ্যে। পুলিশের কাজের মধ্যেই জনগণ ও সরকারের মধ্যকার সম্পর্কের ধরন প্রতিফলিত হয়। বস্তুত সরকারের প্রশাসনিক রূপটি পুলিশের কাজের মধ্যে জনগণের মুক্ত দৃষ্টির আওতায় থাকে। অন্যান্য সরকারি প্রতিষ্ঠানের কাজ এত প্রত্যক্ষভাবে জনগণের বোধগম্য হয় না। জনগণের জীবনে পরোক্ষভাবে অন্যান্য প্রশাসন ক্রিয়াশীল থাকে। তাই সরকারের পুলিশ বিভাগ অন্যান্য বিভাগের চেয়ে বেশি সংবেদনশীল। সব সরকারকেই পুলিশ বিভাগ নিয়ে সতর্ক পদক্ষেপ নিতে হয়।
বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে নানা সংস্কারের মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক বিনির্মাণ এগিয়ে চলে। পূর্ণাঙ্গ রূপ পেতে যেকোনো প্রতিষ্ঠানকে সময় নিতে হয়। কিন্তু পুলিশ বিভাগ যেহেতু সরকার ও জনগণের প্রত্যক্ষ সম্পর্কের অবয়বকে চিত্রিত করে, এর বিনির্মাণে ত্রুটি বা দীর্ঘসূত্রতা সরকারকে সব সময় একটি কঠিন জবাবদিহিতার মধ্যে ফেলে দেয়। ক্রমবর্ধমান চাহিদা সব কিছুতেই থাকে একটা সমাজে। তাই প্রাতিষ্ঠানিক শক্তি বৃদ্ধিও সরকারের নীতিমালায় অগ্রাধিকার পেয়ে থাকে। গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারগুলোয় জনগণ সামগ্রিক সহযোগিতা করে আসছে। নানা প্রতিকূলতা সত্ত্বেও সরকার জনগণের জানমাল নিরাপত্তা রক্ষাকারী প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পুলিশকে যুগোপযোগী করায় সচেষ্ট আছে।
পিতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় নারীর সামাজিক অধিকারগুলো অবহেলিত থাকে। সংবিধানে স্বীকৃত নারী-পুরুষের সমানাধিকার বাস্তবায়নের দায়িত্ব সব সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রত্যক্ষ পরিচর্যায় পুলিশে প্রথম নারী সদস্য অন্তর্ভুক্ত করা হয় ১৯৭৪ সালে। নারী সদস্যের অন্তর্ভুক্তিতে দেশের অভ্যন্তরে সামাজিক কোনো প্রতিবন্ধকতা ঘটেছে বলে মনে হয় না। বাংলাদেশের জনগণ যে রক্ষণশীলতাকে প্রশ্রয় দেয় না এটা তার বড় প্রমাণ। ইতিমধ্যে শান্তিরক্ষা মিশনে জাতিসংঘের হয়ে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে সাফল্যের সঙ্গে কাজ করছেন নারী পুলিশ সদস্যরা। গত ১০ বছরে বিভিন্ন র্যাংকের নারী পুলিশ জাতিসংঘের বিভিন্ন মিশনে কাজ করেছেন। বর্তমানে হাইতিতে একটি পূর্ণাঙ্গ নারী পুলিশের দল কর্মরত আছে। বাংলাদেশ পুলিশ উইমেন নেটওয়ার্ক গঠিত হয়েছে। ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হিসেবেও নারী সদস্য কাজ করছেন। এতে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও একটা আধুনিক ভাবমূর্তি গড়ে উঠেছে। অনেক দৃষ্টান্ত তৈরি হয়েছে। এই নিবন্ধকার ৪৫ সদস্যের পুলিশ বাহিনীকে পূর্ব তিমুরে জাতিসংঘের শান্তি মিশনে নেতৃত্বে দিতে পেরেছেন।
বাংলাদেশ পুলিশে নারীর ভূমিকা মূল্যায়ন করার সময় এসেছে। পুলিশ বিভাগে সংস্কারের মাধ্যমে নারীর অবস্থানকে দৃঢ়তর করা, সংখ্যা বৃদ্ধি করা এবং সর্বক্ষেত্রে যথোপযুক্ত গুরুত্ব দেওয়া দেশের উন্নয়নের জন্য কাম্য। পুলিশের বিভাগীয় উন্নয়ন ধারায় নারী সদস্যের ভূমিকাকে নিশ্চিত করার জন্য পরিকল্পনা, মনিটরিং এবং প্রশাসনিক গবেষণার বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ প্রয়োজন। জনগণের আস্থাভাজন সংগঠন হিসেবে বাংলাদেশ পুলিশকে বিনির্মাণের সর্বস্তরে নারী সদস্যের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণের সময় এসেছে।
আধুনিক সব রাষ্ট্রে নারী-পুরুষের আধিকার সমান। বাংলাদেশের সংবিধানেও এই সমানাধিকারের স্বীকৃতি রয়েছে। বিশাল জনগোষ্ঠীর অর্ধেক অংশ নারী। সুতরাং সব উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে নারীর অংশগ্রহণ ছাড়া কোনো পরিকল্পনাই বাস্তবায়নযোগ্য নয়। বাংলাদেশ পুলিশ সার্ভিসে নারী সদস্যের অন্তর্ভুক্তি এ দেশের সামগ্রিক পরিকল্পনায় সার্থকভাবেই রূপায়ণের প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। মোট পুলিশ সদস্যের মধ্যে অনুপাত যদিও কম, সরকারের সুবিবেচনায় নিশ্চয়ই নারী-পুরুষের অনুপাত বৈষম্যটি ক্রমেই কমে আসবে। পুলিশে নারীর অংশগ্রহণ সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য হয়েছে বলেই সদস্য সংখ্যা বাড়ানোর কোনো প্রতিবন্ধকতা নেই। এ ছাড়া নারী সমাজের মধ্যে পুলিশে অংশগ্রহণ স্পৃহা ইদানীং নিয়োগ নির্বাচনকালে চোখে পড়ার মতো। শুরুতে জনগণের মধ্যে নারীর পুলিশে অংশগ্রহণ একটা চমক সৃষ্টি করেছিল, কিন্তু তা কোনো অস্বাভাবিক ব্যাপার হিসেবে পরিগণিত হয়নি। বরং নানারকম সামাজিক বিশৃঙ্খলা দমন এবং জনগণের শান্তি রক্ষায় প্রশিক্ষিত নারী পুলিশ যথাযোগ্য ভূমিকা পালন করতে পারায় সরকার ও জনগণের কাছে প্রশংসিত হয়েছে। ক্যাডার সার্ভিসে ক্রমোচ্চ পদে পুলিশ নারীর উত্তরণ ও কর্মক্ষেত্রে সাফল্য সব মহল প্রশংসার চোখে দেখেন। ডিআইজি, এডিশনাল ডিআইজি, পুলিশ সুপার, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার, সহকারী পুলিশ সুপার ইত্যাদি পদে সংখ্যায় কম হলেও প্রফেশনাল সাফল্য সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে। দাঙ্গা দমন, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা ইত্যাদি ক্ষেত্রেও পুলিশের নারী সদস্যরা সাফল্য দেখাচ্ছেন। বিভিন্ন শাখা ও বিভাগে কাজ করে এই নিবন্ধকারের অভিজ্ঞতা হয়েছে, পুলিশের অভ্যন্তরে নারী-পুরুষের একত্র অংশগ্রহণ পরস্পরের প্রতি একটা মর্যাদাপূর্ণ সম্পর্ক রচনা করেছে। এ বিষয়টি জনগণের কাছে প্রচার করা গেলে আরো অধিক হারে নারীর পুলিশে যোগ দেওয়ার আকাঙ্ক্ষা জন্মাবে। অন্যান্য বাহিনীতে নারীর অংশ নেওয়ার জন্য বিজ্ঞাপনে গুরুত্ব দেওয়া হয়ে থাকে। পুলিশে নিয়োগ প্রচারের সময় এ বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়া বাঞ্ছনীয়।
আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশ পুলিশের নারী সদস্যের অংশগ্রহণ আরো বাড়ানোর জন্য ইংরেজি ভাষা শিক্ষা, ড্রাইভিং এবং বিভিন্ন দেশের সমাজ ও সংস্কৃতি সম্পর্কে প্রশিক্ষিত করতে বিভাগীয় ট্রেনিং ইনস্টিটউট প্রতিষ্ঠার কথা ভাবা যায়। এতে নারী-পুরুষ উভয়ের মানসিক বিকাশের সুবিধা চলমান রাখা যাবে। বিভিন্ন দেশে নিরাপত্তাবিষয়ক ট্রেনিং, সেমিনার, ওয়ার্কশপ ইত্যাদিতে অংশগ্রহণের ব্যবস্থা বৃদ্ধি করা দরকার। এতে সদস্যদের একটা বৈশ্বিক দৃষ্টি তৈরি হবে। বাংলাদেশে কর্মরত আন্তর্জাতিক সংগঠনগুলোর সহায়তা সর্বক্ষেত্রেই প্রসারিত হচ্ছে। পুলিশের নারী সদস্যদের প্রকৃত উন্নয়নে তারা অগ্রণী হবেন বলে মনে হয়। আয়োজনের দিকটা বাড়ানো দরকার। অর্থাৎ সার্বক্ষণিক সংযোগ রক্ষা করার মতো আয়োজন। নিজেদের প্রয়োজন তাদের জানানো এবং ফিডব্যাক গ্রহণের উপযুক্ত বিভাগ তৈরি রাখা। 'উন্নয়ন সেল' গঠন করে গবেষণা চালু করতে পারলে সার্বক্ষণিক সংযোগের প্রয়োজনীয় উপযোগ সময়মতো নির্ণয় করা যাবে।
পুলিশ বাহিনির ভাবমূর্তি প্রতিষ্ঠার জন্য সর্বাত্মক গবেষণা ও নিত্য উন্নয়ন দরকার। অষ্টপ্রহর দেশ ও জাতির জানমাল রক্ষা ও শান্তি স্থাপনের দায়িত্বে নিয়োজিত বাহিনীর গ্রহণযোগ্যতা পারস্পরিক সন্মানের ওপর নির্ভরশীল। সরকারের সব প্রচেষ্টা সফল হবে পুলিশকে আধুনিক রাষ্ট্রযন্ত্রের আধুনিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে পারার মাধ্যমে। জনগণকে এ কথা অবহিত করার মাধ্যমে যে পুলিশের হাত জনগণের সামনে প্রসারিত। সরকারের সুনাম এই প্রসারিত হাতের সাফল্যের মধ্যেই বিদ্যমান।
আমাদের এই প্রিয় দেশ অনেক রক্ত, ত্যাগ আর সংগ্রামের মধ্য দিয়ে অর্জিত মুক্তিযুদ্ধের ফসল, যেখানে বাঙালি পুলিশ প্রথম আক্রান্ত হয়েছিলেন এবং শহীদ হয়েছিলেন। শহীদদের পরিবার-পরিজন এই স্বাধীন বাংলাদেশে বাস করছেন। আশাবাদী মানুষ মাত্রই আকাঙ্ক্ষা করবে, তাদের পূর্বপুরুষের রক্তে গড়া এ দেশের এই প্রতিষ্ঠানটি ঠিক সে রকম মর্যাদাসম্পন্ন হবে, যা হবে সবার গৌরব এবং অনুকরণীয়।
লেখক : অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার
ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)








