আফ্রিকায় জমি লিজ নিয়ে কৃষিকাজে বিনিয়োগ

 

আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে জমি লিজ নিয়ে কৃষিকাজ করার জন্য বিনিয়োগ করতে বাংলাদেশ থেকে অর্থ নিয়ে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর অর্থনীতিবিষয়ক উপদেষ্টা ড. মসিউর রহমানের নেতৃত্বাধীন এ সংক্রান্ত কমিটি বেসরকারি খাতের 'নিটল নিলয় গ্রুপ'কে উগান্ডায় ১০ হাজার হেক্টর জমি লিজ নিয়ে কৃষিকাজ করার জন্য ৮০ লাখ ডলার নেওয়ার অনুমোদনের বিষয় চূড়ান্ত করেছে। মহাদেশটিতে বিস্তীর্ণ আবাদি জমি বছরের পর বছর ধরে পড়ে আছে, যেখানে বছরে গড়ে এক থেকে দুই ডলার দিয়ে এক একর জমি লিজ নেওয়া যায়। সেখানকার জমি ধান, ভুট্টা, গম প্রভৃতি উৎপাদনের জন্য উপযোগী।

তানজানিয়ায় ৩০ হাজার হেক্টর জমি লিজ পেয়েছে বলে দাবি করে সেখানে কৃষিকাজে বিনিয়োগের জন্য অর্থ নিয়ে যাওয়ার অনুমতি চেয়ে সরকারের কাছে আবেদন করেছে 'এগ্রিটেক' নামে অন্য একটি কোম্পানি। 'আইপিএসএসএল' নামে আরেক বাংলাদেশি কোম্পানি গাম্বিয়ায় জমি লিজ পেয়েছে বলে দাবি করে অর্থ নেওয়ার অনুমতি চেয়েছে। এ দুই কোম্পানির আবেদন অবশ্য এ মুহূর্তে সরকার বিবেচনা করবে না বলে উচ্চ পর্যায়ের সরকারি সূত্রে জানা গেছে।

বেসরকারি কোম্পানির পাশাপাশি সরকারিভাবেও বাংলাদেশ আফ্রিকায় জমি লিজ নিয়ে কৃষিকাজের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল সম্প্রতি আফ্রিকার সদ্য স্বাধীন রাষ্ট্র দক্ষিণ সুদান সফর করে সেখানে সরকারি পর্যায়ে জমি লিজ নিয়ে কৃষিকাজের জন্য দেশটির সঙ্গে একটি সমঝোতা স্মারক সই করেছে। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সমঝোতা স্মারকের অধীনে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন সংস্থা (বিএডিসি) দক্ষিণ সুদানে কৃষিকাজের ব্যবস্থা করবে। স্থলবেষ্টিত ৩ লাখ ৩০ হাজার বর্গমাইলের দক্ষিণ সুদানে জনসংখ্যা মাত্র ৯০ লাখ। অর্থাৎ নতুন এই দেশটি আয়তনে বাংলাদেশের চেয়ে পাঁচগুণ বড় হলেও লোকসংখ্যা ১৭ ভাগের এক ভাগ মাত্র। ফলে সেখানে অনেক জমি পতিত রয়েছে। হোয়াইট নাইল নদ (সাদা নীল) অববাহিকার দক্ষিণ সুদানে আবাদি জমির শতকরা ৪ ভাগ মাত্র ব্যবহৃত হয়। অবশিষ্ট জমি পতিত। ওইসব জমিতে শুষ্ক মৌসুমেও পানির কোনো অভাব হয় না।

কেনিয়ায় সরকারের সঙ্গে জমি লিজ নিয়ে কৃষিকাজ বিষয়ে বাংলাদেশের প্রতিনিধি দল আলোচনা করেছে। কেনিয়া জানিয়েছে, তাদের দেশে লিজ দেওয়ার মতো জমি রয়েছে। বাংলাদেশকে এ ব্যাপারে প্রস্তাব পাঠানোর জন্য বলেছে। কেনিয়ায় 'পোর্ট লামা' বন্দরের আশপাশে জমি লিজ নিলে ফসল সহজেই নিয়ে আসা যাবে। দেশটি ওই এলাকায় জমি লিজ নেওয়ার জন্য বাংলাদেশকে বলেছে। আফ্রিকা মহাদেশে

কৃষিকাজের বিষয়টি কেনিয়ায় অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস থেকে দেখাশোনা করা হয়ে থাকে। কিন্তু ওই দূতাবাসে পর্যাপ্ত লোকবল নেই। বিশেষ করে কেনিয়ায় অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসে কোনো কৃষি বিশেষজ্ঞ নেই। ফলে বিভিন্ন ধরনের সমস্যা হচ্ছে বলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে।

আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে জমি লিজ নিয়ে সেখানে কৃষিকাজ করে ফসল ফলানোর ব্যাপারে বেসরকারি খাত থেকে বেশ কয়েক বছর ধরে আলোচনা করা হচ্ছিল। ২০১০ সালের জুলাইয়ে পররাষ্ট্র সচিব মিজারুল কায়েসের নেতৃত্বে একটি সরকারি প্রতিনিধি দল মহাদেশটির বিভিন্ন দেশ সফর করে সেখানে কৃষিকাজের সম্ভাবনা দেখতে পায়। তারপর বেসরকারি কোম্পানিগুলো আফ্রিকায় এ কাজে বিনিয়োগে সরকারের কাছে অর্থ নিয়ে যাওয়ার অনুমতি চায়।

আফ্রিকায় কৃষিকাজে বাংলাদেশের বিনিয়োগের ব্যাপারে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সার্বিক সহায়তায় আগ্রহী হলেও আপত্তি করে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ধারণা, আফ্রিকায় কৃষিকাজে বিনিয়োগের নামে বিভিন্ন কোম্পানি বাংলাদেশ থেকে অর্থ পাচার করার চেষ্টা করতে পারে। কিন্তু সার্বিক পর্যালোচনার পর সরকার তার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে আফ্রিকায় কৃষিকাজে অর্থ বিনিয়োগে অনুমতি দিতে যাচ্ছে।

প্রসঙ্গত, দেশের বাইরে বৈদেশিক মুদ্রা বিনিয়োগ করতে হলে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন দরকার হয়। এ ব্যাপারে যোগাযোগ করা হলে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আতিউর রহমান সমকালকে বলেন, আফ্রিকায় কৃষিজমিতে বিনিয়োগের জন্য বৈদেশিক মুদ্রা বাইরে নেওয়ার সরকারি কোনো প্রস্তাব তার কাছে এখনও আসেনি। এ বিষয়ে সরকারের একটি কমিটি কাজ করছে, যেখানে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিনিধি রয়েছেন। তার জানামতে, এ ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।

কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নিটল নিলয় গ্রুপকে শর্তসাপেক্ষে এ অনুমতি দেওয়া হচ্ছে। শর্ত অনুসারে নির্ধারিত 'গ্রেস পিরিয়ড' অতিবাহিত হওয়ার পর বিনিয়োগের অর্থের একটা অংশ দেশে ফিরিয়ে আনতে হবে। বাংলাদেশে খাদ্য ঘাটতি দেখা দিলে আফ্রিকায় উৎপাদিত ফসলের একটা অংশ বাংলাদেশে নিয়ে আসতে হবে। আফ্রিকার দেশে দেশে কৃষিকাজ করার জন্য বাংলাদেশের কিছু বিশেষজ্ঞ ও কৃষকের জন্য সেখানে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। তবে মহাদেশটিতে বেকার জনগোষ্ঠীর হার অতি উচ্চ হওয়ায় কৃষিকাজের বেশির ভাগ কাজটা ওইসব দেশের স্থানীয় জনগণ করবে বিধায় ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ কম।

 

 

Share/Save/Bookmark

abohoman

solid

আর্কাইভ

যোগাযোগ

পাঠক সংখ্যা

164044
TodayToday794
This weekThis week5164
This monthThis month14778
Guests 9